Theme Layout

Boxed or Wide or Framed

Theme Translation

Display Featured Slider

Yes

Featured Slider Styles

[Centred][caption]

Display Grid Slider

No

Grid Slider Styles

[style5][caption]

Display Trending Posts

Display Author Bio

Yes

Display Instagram Footer

Yes

Dark or Light Style

Showing posts with label West Bengal. Show all posts
Showing posts with label West Bengal. Show all posts
আকাশ ছুঁয়ে আজও দাঁড়িয়ে বহুলাড়ার সিদ্ধেশ্বর মন্দির

আকাশ ছুঁয়ে আজও দাঁড়িয়ে বহুলাড়ার সিদ্ধেশ্বর মন্দির


শুধু বিষ্ণুপুর নয়, গোটা বাঁকুড়া জেলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুরাকীর্তির বহু নিদর্শন। এই জেলারই একটা গ্রাম 'বহুলাড়া'। সাধারণ গ্রামের মানুষের কাছে 'বোল্যাড়া' বলে পরিচিত। কিন্তু কী আছে এই বহুলাড়ায়? একবার বিষ্ণুপুরে মন্দিরের খোঁজে গিয়ে জানতে পারি যে বাঁকুড়ার এই বহুলাড়া গ্রামে জৈন আমলের একটি প্রাচীন মন্দির আছে। মন্দিরটি এখন সিদ্ধেশ্বর শিবের মন্দির নামে পরিচিত হলেও প্রথমদিকে এটা জৈন মন্দির ছিল। এই রাঢ়দেশে একসময় জৈন ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল। জৈনরা 'রাঢ়' শব্দটিকে 'লাড়' বলতেন। এই 'লাড়' শব্দ থেকেই 'লাড়া' শব্দটি এসেছে। অনেকের কাছে এই মন্দির এখনও অজানা। বিষ্ণুপুরের প্রায় সব দর্শনীয় স্থানই আমার ঘোরা, কিন্তু শহর থেকে কিছু দূরে বহুলাড়ার এই মন্দির আমার দেখা হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ পেয়ে ঘুরে এলাম বহুলাড়া থেকে।

ইতিহাস আঁকড়ে রয়েছে বহুলাড়ার মন্দির
শনি-রবি পরপরপ দুদিন ছুটি। উইকএন্ড ট্রিপে এবার ভাবলাম বাইক নিয়ে কোথাও গেলে কেমন হয়। সিদ্ধেশ্বর শিবের মন্দিরটির সন্ধান পাওয়ার পর থেকেই সেখানে যাওয়ার একটা ইচ্ছে জেগে ছিলো মনে। সকাল সকাল বাইকে চেপে বেরিয়ে পড়লাম বহুলাড়ার সেই প্রাচীন মন্দিরের খোঁজে। কিন্তু কোথায় এই বহুলাড়া? জানা যায় যে বিষ্ণুপুর আর বাঁকুড়া শহরের মধ্যে ওন্দার কাছে কোনও এক জায়গা। 'ওন্দাগ্রাম' নামটা আমার পরিচিত। বিষ্ণুপুর থেকে বাঁকুড়া যাওয়ার সময় দেখেছি। বাস যায়, রেল স্টেশন আছে। পরিচিত রাস্তায় বিষ্ণুপুর এসে তারপর বাঁকুড়া যাওয়ার রাস্তা ধরে রামসাগর পেরিয়ে চলে এলাম 'ওন্দা'। স্থানীয় লোকেরা 'ওঁদা' বলে।

ওন্দা চৌমাথার মোড়ে এসে কোনদিকে যাবো বুঝতে পারছিলাম না। এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে দেখে বহুলাড়া যাওয়ার পথ জেনে নেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার উচ্চারণটা যেন তার কাছে দুর্বোধ্য মনে হল। কাছাকাছি আরও দুটো লোককে দেখে মন্দিরের কথা জিজ্ঞেস করলাম। ওরা বলছিল বেউল্যাড়া না কী যেন! ঠিক বুঝতে পারলাম না। তারপর জিজ্ঞেস করলাম এখানে পুরাতন মন্দির কোথায় আছে? হঠাৎ পিছন থেকে একজন বলে উঠলো! হ্যাঁ, সেরকম একটা মন্দির আছে বটে...। এখান থেকে এই ডানদিকের রাস্তা ধরে একেবারে সোজা চলে যান। বাজার পেরিয়ে স্টেশন রোড ধরে খানিক এগিয়ে দেখি সামনে লেভেল ক্রসিং। তারপর মাঠ ঘাট পেরিয়ে অনেক দূর আসার পর পেলাম একটা গ্রাম। গ্রামের নাম পাত্রহাটি। একজন সাইকেল-আরোহীকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বহুলাড়া মন্দিরটা এই দিকেই তো? তার কাছে জানা গেলো, একটু এগিয়ে ডান হাতে যেতে হবে। কিছুক্ষনের মধ্যেই দেখতে পেলাম একটা তিনমাথার মোড়। ওখান থেকে ডানদিকের একটা সরু পাকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম। খানিকটা গিয়ে একটা বাঁক ঘুরতেই চোখে পড়ল বেশ বড় এক মন্দির।

প্রাচীন ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে
সত্যিই বেশ বড় মন্দির। সামনে 'আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া'র একটা বোর্ড টাঙানো আছে। বহুলাড়ার এই মন্দিরটি এখন হিন্দুদের শিব মন্দির হিসেবে পরিচিত হলেও অতীতে এটা ছিল জৈনদের। এই সিদ্ধেশ্বর শিবের মন্দিরটি ওড়িশার রেখ-দেউল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। রেখ-দেউলটি চারপাশের জমি থেকে খানিকটা উঁচুতে, একটা সমতল জায়গার ওপর অবস্থিত। মন্দিরের বাইরের দেওয়াল জুড়ে সুন্দর কারুকাজ করা। মন্দিরটি পোড়ামাটির ছোট ছোট ইট দিয়ে তৈরি এবং ইটের গায়ে নিপুণ খোদাই কাজগুলো পঙ্খের পলেস্তারা দিয়ে ঢাকা। দেওয়ালের গা থেকে পলেস্তারা খসে পড়ায় অনেক জায়গায় পোড়ামাটির নকশা টালিগুলো বেরিয়ে পড়েছে। মন্দিরের চারপাশে চোখ ফেরাতেই দেখা গেল মাকড়া পাথরের ছোট ছোট কয়েকটি স্তম্ভ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মূল মন্দিরের চারপাশে প্রথাগতভাবে তৈরি যেসকল উপ-মন্দির ছিল, এগুলো তার অবশেষ হতে পারে।

বাইরের দেওয়াল জুড়ে সুন্দর কারুকাজ করা
ইটের তৈরি এই বিশাল রেখ-দেউলকে বাঁকুড়া জেলার শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি বলা যেতে পারে। শুধু বাঁকুড়া কেন, সারা বাংলায় রেখ-দেউলের যে কয়েকটি নিদর্শন আছে তার মধ্যে বহুলাড়ার এই দেউলটি সবচেয়ে সুন্দরতম ইটের মন্দির। কোন প্রতিষ্ঠালিপি না থাকায় মন্দিরটির নির্মাণকাল নিয়ে নানা অভিমত আছে। প্রত্নতাত্বিকরা মনে করেন এই মন্দিরটি পালযুগের তৈরি। এটা একটি শিব মন্দির হলেও ইতিহাসবিদরা নিশ্চিত নন যে নির্মাণকালে কোন দেবতার প্রতি এটিকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। মন্দিরটি হিন্দুদের না জৈনদের দ্বারা তৈরি সে বিষয়েও নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।

খোদিত ইটের কাজ এবং পঙ্খ-পলেস্তারা
মন্দিরের পাশে রাস্তার সমতলে অনেকগুলো ইটের ছোটো ছোটো স্তূপ দেখতে পাওয়া গেলো। ভারতের প্রত্নতত্ব বিভাগ 'দ্য আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া'র পক্ষ থেকে খোঁড়াখুঁড়ি করে এই স্তূপগুলোর সন্ধান পাওয়া গেছে, এখান থেকে জৈনমূর্তিও পাওয়া গেছে। প্রায় উনিশটি এরকম স্তুপ পাওয়া গেছে তারমধ্যে ষোলোটি গোলাকার স্তূপ। বৌদ্ধ শ্রমণদের এরকম গোলাকার স্তুপে সমাধিস্থ করা হতো। এই স্তূপ অর্থাৎ চৈতগুলো দেখে ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন এটা ছিল বৌদ্ধ মন্দির। একসময় বৌদ্ধ ও জৈন উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ এই এলাকায় বসবাস করতো ফলে এখানে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব ছিল। জৈনদের মধ্যেও সেকালে স্তূপপূজো দেখা যেতো। মন্দিরের গর্ভগৃহে রাখা পার্শ্বনাথের মূর্তি দেখে অনেকে এটাকে জৈন মন্দির বলেই অনুমান করেন। পরবর্তীকালে পাল রাজাদের আমলে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব কমে আসে এবং ধীরে ধীরে শৈব্যধর্মের প্রভাব বাড়তে থাকে। অনেকের ধারণা ঐ সময় মন্দিরে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং হিন্দু মন্দির রূপে সিদ্ধেশ্বর শিবের নামে পরিচিতি পেয়েছে। মন্দিরের দরজা বন্ধ। তাই ভিতরে কোন দেবতার বিগ্রহ বা মূর্তি আছে বুঝতে পারলাম না। মন্দিরের দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে এবার ফেরার পথ ধরি।

মন্দিরের পাশে ইটের সমাধি স্তূপ
দেখেশুনে, ছবি তুলে যখন ফিরে আসছি তখন আলাপ হলো এক সোলো ট্রাভেলারের সাথে। মাঝবয়সী ভদ্রলোক, আমার মতো আঞ্চলিক ইতিহাসের খোঁজে বর্ধমান থেকে বাইক চালিয়ে এখানে এসেছেন। আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি আমাকে আরও এক প্রাচীন মন্দিরের সন্ধান দিলেন। বহুলাড়া থেকে বেরিয়ে এবার চললাম সেই প্রাচীন মন্দিরের খোঁজে।

বাঁকুড়ার শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি...ইটের তৈরি এই রেখ-দেউল
» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল (তথ্যসূত্রঃ- 'পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি' - বিনয় ঘোষ, 'বাঁকুড়া জেলার ইতিহাস' - অমিয় কুমার বন্দোপাধ্যায়)
SIDDHESHWAR TEMPLE, BAHULARA, BANKURA, WEST BENGAL
Continue Reading
Arabinda Pal
1 Comments

You Might Also Like

প্রকৃতির মাঝে, অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে

প্রকৃতির মাঝে, অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে


দোলের সময় টানা চার দিনের ছুটি! প্রথম দু'দিন ঘরে বসে ব্লগে লেখালেখি করে সময়টা কাটিয়ে দিলাম। কোভিডের প্রথম ঢেউ পার হয়ে সবে জীবনযাত্রা স্বাভাবিকের দিকে। উড়ু উড়ু মন সব সময় যেন বাইরে কোথাও ঘুরু ঘুরু করার জন্য ছটফট করছে। মার্চের শেষে শীত ফুরিয়ে গরম পড়তে শুরু করেছে। চারদিকে ভোটের উৎসব চলছে। ভাবছি ঘরে না বসে থেকে কোথাও ঘুরে আসি। এমন সময় উৎপল ফোন করে বলল, 'অনেক হয়েছে, আর এভাবে ঘরে থাকা যায় না, চলো পুরুলিয়ার দিকে ঘুরতে যায় ওদিকে ভোট হয়ে গেছে সুতরাং চিন্তার কোনো কারণ নেই'। হাতে এখনো দু'দিনের ছুটি রয়েছে। শেষমেশ প্ল্যানটা করেই ফেললাম। ভোরবেলা খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে হবে। রাতে ক্যামেরা আর মোবাইলে চার্জ দিয়ে শুয়ে পড়লাম। পরদিন সোমবার সকাল সাড়ে ছ'টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে জামাকাপড় পরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়। দক্ষিণবঙ্গের এই অঞ্চলটা আমার ঘোরা হয়নি। খড়গপুর-বিষ্ণুপুর হয়ে দুর্গাপুর যাওয়ার রাস্তা ধরে চলে এলাম ধলডাঙ্গা মোড়ে। দুর্গাপুর যাওয়ার সময় এই ধলডাঙ্গার মোড়ের উপর দিয়ে বহুবার গিয়েছি কিন্তু বাঁ-দিকের রাস্তায় কোনো দিন যায়নি। খিদেটা বেশ জমিয়ে পেলেও খাওয়ার মতো কোনো জায়গা কিছুতেই পাচ্ছিলাম না। রাস্তার পাশে একটা মিষ্টির দোকান দেখে ভাবলাম ব্রেকফাস্টটা সেরে নিই আগে। গরম চা, সাথে লুচি সবজি খেয়ে আবার স্টিয়ারিংয়ে বসলাম। এবার গাড়ি ছুটতে শুরু করল অচেনা রাস্তা ধরে। চলার সময় রাস্তার ধারে দেখি লাল রঙের সুন্দর 'মান্দার' ফুল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ফুলের নাম দিয়েছিন পারিজাত ফুল। গাড়ি দাঁড় করে কয়েকটা ছবি নিলাম।

সূর্য মন্দির
আবার গাড়ি এগিয়ে চললো। স্টেশন পেরিয়ে শহরে যখন ঢুকলাম ঘড়িতে তখন প্রায় সকাল এগারোটা বাজে। পুরুলিয়া শহরে উৎপলের বোনের বাড়ি থাকায় বেশ সুবিধেই হলো। বিগবাজারের ঠিক উল্টোদিকেই বাড়ি। পুরুলিয়া এই প্রথম এলাম। কলকাতা থেকে এতো দূরে এই শহরে কি নেই! সমস্ত বড় বড় শপিং মল থেকে শুরু করে নামিদামি ব্র্যান্ডের শোরুম সব আছে। ভীষণ ভালো লাগলো এই শহরটাকে। উৎপলের ভগ্নিপতির রয়্যাল এনফিল্ডটা নিয়ে দুজনে মিলে বেরিয়ে পড়লাম সাহেব বাঁধের দিকে।

জাতীয় সরোবর সাহেব বাঁধ এখন পুরুলিয়ার অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান হয়ে উঠেছে। এর সৌন্দর্যের হাতছানি এড়াতে পারে না কেউ। এই সাহেব বাঁধের ছোট্ট একটা ইতিহাস আছে। অবিভক্ত মানভূমের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার কর্ণেল টিকলে পুরুলিয়া শহরের জল কষ্ট দূর করার জন্য পঞ্চকোট রাজের সম্মতি নিয়ে ঐ পুকুরকে কেন্দ্র করে একটা জলাশয় তৈরি করেন। ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দে জেলবন্দী কয়েদি ও কিছু দিনমজুর লাগিয়ে কৃত্রিম লেকের মতো এক বিশাল সরোবর খননের কাজ শুরু করেন। এরপর পাঁচ বছর ধরে চলে এই খনন কাজ। ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দে খননের কাজ শেষ হলে কর্নেল টিকলে সাহেবের নাম অনুসারে পঞ্চকোট রাজের ঐ পুকুরটা 'সাহেব বাঁধ' নামে পরিচিত হয়। এই সরোবরের আরও একটা নামও রয়েছে – 'নিবারণ সায়র'। জেলার বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ঋষি নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্তের স্মরণে এই সাহেব বাঁধের নাম পরিবর্তন করে 'নিবারণ সায়র' করা হয়।

সাহেব বাঁধ
সাহেব বাঁধের পাশেই থাকা সূর্য মন্দির দর্শন করে চারপাশটা ঘুরে দেখলাম। সরোবরের চারদিক ঘিরে রয়েছে কালো পীচের রাস্তা। বিশাল জলাশয়ের মাঝে রয়েছে একটা দ্বীপ এবং দক্ষিণ দিকের অপর দ্বীপটাতে তৈরি হয়েছে বনবিভাগের মনোরম পার্ক 'সুভাষ উদ্যান'।

শিকারা পয়েন্ট
সাহেব বাঁধের উত্তর প্রান্তে নর্থ লেক রোডে 'শিকারা পয়েন্ট'-এ ঢুকে দেখি কাশ্মীরের শিকারাতে চড়ার মতো এখানে ব্যবস্থা রয়েছে। একেবারে কাশ্মীরি কাপড়ে মোড়া গদি দিয়ে তৈরি এক একটা শিকারায় পাঁচ জন করে বসতে পারবেন। টিকিট কাউন্টারের এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, শিকারাতে চড়ার জন্য এক ঘন্টার জন্য ভাড়া পাঁচশো টাকা এবং তিরিশ মিনিটে তিনশো টাকা।

পর্যটকের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে
সাহেব বাঁধ থেকে ঘুরে এসে উৎপলের বোনের বাড়িতে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া হলো। বেশ কিছুক্ষণ বসে গল্পগুজব করে কাটিয়ে দুপুর দেড়টা নাগাদ আবার বেড়িয়ে পড়লাম অযোধ্যার পথে। অযোধ্যা পাহাড় বেড়াতে এসে সব জায়গা একসাথে ঘুরে দেখা খুবই কঠিন। সময় ও দুর্গমতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অযোধ্যা পাহাড়ে ওঠার জন্য এখন অনেকগুলো রুট আছে। পুরুলিয়া-টামনা-সিরকাবাদ হয়ে, বলরামপুর-বাঘমুণ্ডি হয়ে, সুইসা-বাঘমুণ্ডি হয়ে, ঝালদা-বেগুনকোদর হয়ে আসা যায়। আবার উরমা-ঘাটবেড়া হয়েও আসা যায়। এখন আরও নতুন রাস্তা তৈরি হয়েছে। তবে প্রধান প্রবেশপথ দুটো; একটা পুরুলিয়া শহরের দিক থেকে সিরকাবাদ হয়ে অন্যটা বাঘমুণ্ডির দিক থেকে থেকে বাড়রিয়া হয়ে। পুরুলিয়া শহর থেকে যাওয়ার ফলে আমরা সিরকাবাদের রাস্তাটাকেই বেছে নিলাম। তাছাড়া বলরামপুরের রাস্তাটাও ছিল খারাপ। সিরকাবাদ হয়ে অযোধ্যার জার্নিটা ভারী সুন্দর। বাঘমুণ্ডির রাস্তায় কিছুক্ষন চলার পর টামনা মোড় থেকে ন্যাশনাল হাইওয়ে ছেড়ে ডানদিকে টার্ন নিয়ে চললাম সোজা হিল টপের দিকে। দু'পাশে চাষের ক্ষেত আর তার মধ্যেই একের পর এক আদিবাসী গ্রাম ছাড়িয়ে গাড়ি কালো পিচ-ঢালা রাস্তায় এগিয়ে চলল অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে। সিরকাবাদ অতিক্রম করার পর চোখের সামনে ভেসে উঠল পাহাড়ের সারি। অনেকটা অঞ্চল জুড়ে এই অযোধ্যা পাহাড়ের বিস্তার।

চলেছি অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে
পুরুলিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হল এই অযোধ্যা পাহাড়। বহু বছর আগে, অরণ্যবেষ্টিত এই অঞ্চলে যাযাবরের মত ঘুরে বেড়ানো দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর বিরহোড় উপজাতিরা আশ্রয় গ্রহণ করে। তারপর সাঁওতালরা এখানে আসে। এখানের উপজাতি অধিবাসীরা পাহাড়কে দেবতা হিসেবে মনে করে। সাঁওতালি ভাষায় অযোধ্যা পাহাড়কে 'আয়োদিয়া' বলে। যার অর্থ, অযোধ্যা মা সকলকে অতিথিশালার মত এই পাহাড়ে আশ্রয় দিয়েছেন। অযোধ্যা সিং নামে আগে এখানে একজন ভূমিজ জমিদার ছিলেন, যার নামে এই অযোধ্যা পাহাড়ের নামকরণ হয়েছে বলে কথিত আছে।

ভেসে উঠল পাহাড়ের সারি
এখানে বিচিত্র সব পাহড়ের নাম গোর্গাবুরু, চামতাবুরু, কড়াকুবুরু, মাঠাবুরু, গজবুরু এইরকম আরো অনেক নাম আছে যা শেষ করা যাবে না। সাঁওতালি ভাষায় এই 'বুরু' কথার অর্থ পাহাড়। এক একটা পাহাড়ের চূড়ায় এক এক বুরুর অধিষ্ঠান। এদের মধ্যে গোর্গাবুরু কে ছাড়িয়ে চামতাবুরু এখন অযোধ্যা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু চূড়া। আবার এর সঙ্গে রয়েছে কিছু অনুচ্চ বিচ্ছিন্ন পাহাড় যা এখানের উপজাতিদের ভাষায় ডুংরি নামে পরিচিত। উসুলডুংরি, ফলডুংরি লাহাডুংরি আরো কত কি।

উঁচু-নিচু টিলার সমাহার
হিল টপের দিকে যত এগোচ্ছি ততই যেন বিস্ময় বাড়ছে, দুরের পাহাড় ক্রমশ কাছে আসছে। একসময় শুরু হল পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে ওঠা। গাড়ি উঠতে শুরু করল চড়াইতে। কিছুক্ষন পর এক জায়গায় দেখি সর্পিলাকারে পাকদন্ডীর মতো হেয়ার পিন টার্ন নিয়ে রাস্তাটা চলে গেছে অরণ্যের মধ্যে দিয়ে। এঁকে বেঁকে ঘুরে ফিরে চলেছি আরও উপরে।

পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে ওঠা
শুরু হল দুদিকে ঘন জঙ্গল। চারদিকে শুধু জঙ্গল ঘেরা ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের পাহাড় আর পাহাড়। পথে পড়লো ময়ূর পাহাড়। ময়ূর পাহাড়কে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চললাম। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর শুরু হল জনবসতি। পাহাড়ের মাথায় টেবিল টপের মতো বেশ খানিকটা আধা-সমতল অঞ্চল নিয়ে জনবাসতি। একজায়গায় কতগুলো বাস পার্কিং করা দেখে মনে হলো এখানেই বাসস্ট্যান্ড। বুঝতে পারলাম অযোধ্যা হিল টপ গ্রাউন্ডে পৌঁছে গেছি।

হেয়ার পিন টার্ন
আলো পড়ে গেলে লোয়ার ড্যাম ভিউ পয়েন্ট থেকে ভাল দেখা যাবে না। অতএব সূর্য ডোবার আগে লোয়ার ড্যাম ঘুরতেই হবে। সোজা চলে গেলাম লোয়ার ড্যামের দিকে। গোটা পাহাড় ছেয়ে আছে বিভিন্ন গাছে। সবুজ গাছে ভরা জঙ্গলকে ভেদ করে আঁকা বাঁকা রাস্তা ধরে চলেছি। অযোধ্যা পাহাড় যেন এক 'সবুজ রাণী' – সৌন্দর্যের এক অপরূপ ডালি সাজিয়ে নিয়ে বসে রয়েছে এখানে প্রকৃতি। এভাবে চলার পথে হাঠৎ চোখে পড়ল একটা ফাঁকা ময়দানে গ্রামের কিছু ছেলে খেলাধুলো করছে। অদূরে দেখা যাচ্ছে আপার ড্যাম। হিল টপ গ্রাউন্ড থেকে আপার ড্যামে পৌঁছনোর এই রাস্তাটা এককথায় অনবদ্য। 

ওভার ফ্লো ব্রিজ
আপার ড্যামে ঢোকার মুখে ওভার ফ্লো ব্রিজের একপাশে গাড়ি রেখে লেকের কাছে গেলাম। ব্রিজের একপাশে ড্যামের সুনীল জলরাশি, অন্যদিকে সবুজের সমারোহ। সবুজের মাঝে লেকের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মন ভরে গেলো। ওভার ফ্লো ব্রিজ থেকে রাস্তার একটা ছোট্ট টার্ন নিতেই একেবারে লেকের পাশে চলে এলাম। লাল রঙের রেলিং দিয়ে ঘেরা ড্যামের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এগিয়ে চলেছি। দোকান পাট নেই কিন্তু এই গরমেও ড্যামের উপর পর্যটকের উপস্থিতি ছিল বেশ নজরকাড়া।

অপার ড্যামের উপর দিয়ে চলেছি
আপার ড্যাম ছাড়িয়ে সুন্দর আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে নামতে থাকলাম। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা ভিউ পয়েন্ট দেখে সেখানে দাঁড়ালাম। এটাই লোয়ার ড্যাম ভিউ পয়েন্টে। এখানে বামনি নদীর জলধারাকে আটকে তৈরি হয়েছে লোয়ার ড্যাম PPSP বা পুরুলিয়া পাম্প স্টোরেজ প্রকল্প। এই লোয়ার ড্যামেরে জল পাম্প করে আপার ড্যামে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর আবার উপর থেকে নীচে ফেলে সেই জলের গতিকে কাজে লাগিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে জলবিদ্যুৎ তৈরি করা হয়। বামনি নদীর ওপর এই ড্যামটা ভারী সুন্দর। লম্বা একহারা লেকটা দূর পাহাড়ে গিয়ে মিশেছে। নীচে গ্রামগুলোকে উপর থেকে ঠিক ছবির মতোই সুন্দর দেখাচ্ছে।

লোয়ার ড্যাম
ভিউ পয়েন্ট থেকে নীচে চোখ যেতেই দেখি আরো একটা ছোটো ড্যাম। এর পোশাকি নাম কেষ্ট বাজার ড্যাম হলেও প্রচলিত নাম লহরিয়া ড্যাম। আগে এই ড্যামের জলের মূল উৎস ছিল কেষ্ট বাজার নালা। বামনী নদীর ওপর ড্যাম দেওয়ার পর এখন লোয়ার ড্যাম এর জল এই কেষ্ট বাজার ড্যামে আসে। আরো নেমে চলে এলাম কেষ্ট বাজার ড্যামের কাছে। কেষ্টবাজার ড্যামের পাশেই রয়েছে লহরিয়া শিব মন্দির সহ অন্যান্য মন্দির। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের পথে। আমাদেরও ফিরতে হবে এবার।

কেষ্ট বাজার ড্যাম
ধীরে ধীরে সূর্যের আলো কমে আসতে লাগলো। সূর্য ঢলবে এখনি। পাহাড়ের কোলে সূর্যাস্ত দেখবো বলে আর দেরি না করে এবার চললাম আপার ড্যামে।

আবার চললাম আপার ড্যামে
আবার খাড়াই পথ ধরে চলেছি অপার ড্যামের দিকে। সুন্দর বাঁধানো রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে গেলাম আপার ড্যামে। ড্যামের একদিকে পাথর দিয়ে বাঁধানো পাড় ঢালু হয়ে নেমেছে লেকের জলে। বিশাল সেই লেকের ওপর সবুজ পাহাড়ী দ্বীপ, তার পিছনে পাহাড়ের সারি। অন্যদিকে থরে থরে সাজানো পাহাড়ের পর পাহাড় যেন সবুজ গালিচা পেতে আছে প্রকৃতি। নিচে বহু দূরে আবছা মতো দেখা যাচ্ছে লোয়ার ড্যাম। একঘেঁয়ে জীবন থেকে বেরিয়ে একটু মুক্ত পরিবেশে শ্বাস নেওয়ার জন্য অন্যান্য পর্যটকদের মতো আমরাও এসেছি প্রকৃতির মাঝে, পাহাড়ের কোলে। লেকের জলে, পাহাড়ের মাথায় তখন শেষ বিকেলের আলো। আকাশে ছড়িয়ে আছে রক্তিম আভা। অসাধারণ সেই ভিউ দেখার জন্য আপার ড্যামে তখন ভিড় করেছে পর্যটকরা।

খাড়াই পথ ধরে চলেছি
ড্যামের উপর এক জায়গায় গাড়ি পার্কিং করে আমরাও সেই পর্যটকদের ভিড়ে মিশে গেলাম। কেউ আনন্দে গান ধরেছে 'লাল পাহাড়ির দেশে যা... রাঙা মাটির দেশে যা...', আর সেই গানের তালে পা মিলিয়ে নাচছে একদল সুবেশী তরুণী। মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।

আপার ড্যাম
পাহাড়ের কোলে ঢলে পড়া লাল টকটকে সূর্যের অস্ত যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। একটা সময় হয়তো সূর্যেরও ক্লান্তি লাগে। অনেক দূরে পাহাড়ের ওপারে একসময় ডুব দিলো সূর্য। সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলে, সেদিনের মতো আমাদের ঘোরা শেষ।

পাহাড়ের কোলে ডুব দিলো সূর্য
থাকার জায়গা এখনো ঠিক হয়নি। গাড়িতে উঠে চলে এলাম হিলটপে হোটেল খুঁজতে। আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল সিএডিসি-র গেস্ট হাউস। প্রকৃতির মধ্যে সৌন্দর্যে ভরা সাজানো ক্যাম্পাসের ভিতরে 'নীহারিকা', 'মালবিকা', 'বিভাবরী' এরকম বেশ কয়েকটা গেস্ট হাউস রয়েছে। সিএডিসি-র রিসেপশন কাউন্টারে যোগাযোগ করলে বলল কোনো রুম খালি নেই কেবল 'তৃষা'-র স্যুটটা খালি আছে। একদম নিরাপদ জায়গা; ফ্যামিলি নিয়ে থাকতে হলে এর কোনো তুলনা হয় না। রুম দেখে আমাদের খুব পছন্দ হল। ঘরগুলো যথেষ্ট পরিষ্কার ও সাজানো গোছানো। তবে শুধুমাত্র রাত্রিটা কাটানোর জন্য আমাদের গুনতে হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার টাকার কাছাকাছি। গাছপালা দিয়ে সাজানো বিশাল বাগান, পরিবেশটা এক কথায় চমৎকার। সারাদিন পথ চলার ধকলে শরীরে ক্লান্তি ছড়িয়ে ছিল তাই ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম।

'তৃষা'-য় আমাদের রাত্রি যাপন
সকালে ঘুম থেকে উঠে সারা দিনের বেড়ানোর প্ল্যান করে নিলাম, এর মধ্যে আবার দুপুরের মধ্যে উৎপলের ঝালদা যাওয়ার প্ল্যান আছে। স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করেই বেড়িয়ে পড়লাম। হিলটপ থেকে বেরিয়ে আপার ড্যাম যাবার রাস্তাকে বামপাশে ফেলে শালবনের পথ ধরে চলেছি অযোধ্যা পাহাড়ের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন ক্ষেত্র মার্বেল লেকের উদ্দেশে। সকালবেলায় এই পাহাড়ের চারিদিকের দৃশ্য অসাধারণ। এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখি পাহাড়ে জিপিএস সঠিক রাস্তা দেখায় না। বেশ গোলকধাঁধার মতো রাস্তা। মার্বেল লেকে যাওয়ার সময় জিপিএস অনুসরণ করে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা, এক জায়গায় পথহারা হয়ে ভুল রাস্তায় চলে গেলাম। পরে এক পর্যটকের সহায়তায় জঙ্গলের পথ ধরে খানিক দূর গিয়ে মিলল মার্বেল লেক যার অপর নাম ইকো পয়েন্ট। মার্বেল লেকের প্রকৃত নাম দুলগুবেড়া বা দুর্গাবেড়া লেক।

চলেছি মার্বেল লেকের দিকে
লেকের স্বচ্ছ নীল জলের জন্য পর্যটকদের কাছে এটা ব্লু-লেক নামেও পরিচিতি লাভ করেছে। মার্বেল লেক আসলে একটা পাথরের খাদান। পুরুলিয়া পাম্প স্টোরেজ প্রোজেক্টের সময় এখান থেকেই পাথর ভেঙে নিয়ে গিয়ে তৈরি করা হয়েছে ড্যামগুলো। বিস্ফোরণ করে পাথর ভাঙতে গিয়ে সেই পাথরের খাঁজে তৈরি হয় এই লেকটা। চারিদিকে উঁচু পাথরের টিলার মধ্যে লেকের সৌন্দর্য্য অতুলনীয়। গ্রামের কয়েকটা বাচ্চা দেখি ওই টিলার উপর থেকে লাফ দিয়ে লেকের জলে স্নান করছিলো। চারদিকে একটা থমথমে নিস্তব্ধতা। একটু শব্দ করলেই প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে।

মার্বেল লেক
মার্বেল লেকের এই মনোরম দৃশ্য দেখার জন্য লেকের পাশে রয়েছে একটা ওয়াচ টাওয়ার। ছায়াহীন লেকের পাড়ে প্রচন্ড রোদে নাজেহাল অবস্থা। মার্বেল লেকে কিছু ছবিটবি তুলে এবার আমরা চললাম বামনি ফলস দেখতে।

ওয়াচ টাওয়ার
মার্বেল লেক থেকে আরও কিছুটা এগিয়ে রাঙা মোড়ের নেতাজি মূর্তির কাছে ডান দিকের রাস্তাটা চলে গেছে বাগমুণ্ডির দিকে। শাল, সেগুন,পলাশের গা ঘেঁষে সবুজ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। তবে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করলো পলাশ। এভাবে খানিকক্ষণ চলার পর বামনি ফলসের কাছে এসে গাড়ি থামালাম।

জঙ্গলে ঘোরা পাহাড়িপথ
রাস্তাটা এখানে বেশ চওড়া। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য অনেকটাই জায়গা রয়েছে। এদিকে প্রচন্ড গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। সামনের একটা দোকানে দেখি চায়ের কেটলি থেকে ধোঁয়া উঠছে। এক কাপ ধূমায়িত চায়ের তৃপ্তি যেন তখন একটু খানি শান্তির চুমুক। চা-দোকানির পরামর্শ অনুযায়ী একটা জলের বোতল কিনে এগিয়ে গেলাম ফলসের দিকে। অযোধ্যা পাহাড়ের বিভিন্ন ফলসের মধ্যে মূল আকর্ষণ বলা যায় এই বামনিকে।

গাড়ি পার্ক করে ফলসের দিকে এগিয়ে গেলাম
এক নির্জন প্রকৃতির বুকে দুরন্ত এই বামনি ফলসটা বেশ বড়। তিন ধাপে নীচে নেমে গিয়েছে। প্রতিটা ধাপ একটা আরেকটার থেকে বেশ নীচে। অগুনতি পাথুরে সিঁড়ি ভেঙে অনেকটাই নীচে নামতে হয়। স্থানীয় দোকানদারের কাছে জানলাম, বামনি ফলসের উপর থেকে একদম নীচের ধাপে নামতে মোটামুটি সাতশো সিঁড়ি ভাঙতে হয়। প্রথম ভিউ কিছুটা নেমে। খুব সাবধানে পা ফেলে ছোট সিঁড়ি ভেঙে আস্তে আস্তে কোনোরকমে প্রথম ভিউ পয়েন্টে পৌঁছালাম। এই পর্যন্ত সকলেই নামতে পারেন। পাহাড়ের ঢালু গায়ে পাথরের বুক চিরে অবিরাম ধারায় ঝরে পড়েছে বামনির জলধারা আর সেই জলধারার নেই কোনো বিরাম। শুধুই সময়ের স্রোতের মতই বয়ে যাওয়া, ফিরে আসার অবকাশ নেই। সামনে বিরাট লেক।

বামনি ফলস
প্রথম ভিউ পয়েন্ট থেকে লেকের দিকে অর্ধেক নামার পরে আর দ্বিতীয় ফলস দেখতে যাওয়ার সাহস হলো না, কারণ নিজেরাই গাড়ি চালিয়ে যাব যদি কোনো অঘটন ঘটে যায় তাহলে মুশকিল হতে পারে। এবার উঠতে হবে। খাড়া সিঁড়ির কয়েক ধাপ উঠে বুঝতে পারলাম যে কাজটা খুব সহজ নয়। বেশ কষ্ট হল উপরে উঠে আসতে। অনেক জায়গায় দম নেওয়ার জন্য দাঁড়াতে হল। উপরে উঠে একটা ছোট্ট দোকানের চেয়ারে হেলান দিয়ে বুক চেপে বসে পড়লাম, শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। লেবু জল খেয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক হলে আবার যাত্রা শুরু করলাম। পাহাড়ি পথ শেষ করে নেমে এলাম পাহাড়ের ঢালে বাঘমুণ্ডির বাড়রিয়া গ্রামে।

বামনি লেক

চড়িদা মুখোশ গ্রাম

অযোধ্যা পাহাড়ের মূল দ্রষ্টব্যগুলো এই বাঘমুণ্ডির দিকেই। এখানে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সবুজের বুকে মিশে থাকা অযোধ্যা পাহাড়ের দৃশ্য সে এক অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করে। বাঘমুণ্ডি পেরোনোর পর দুই ধারের রূপ এবার বদলে গেলো। সুন্দর রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম ঝালদার দিকে। বাঘমুণ্ডি থেকে কিছুটা যাওয়ার পর আমাদের স্বাগত জানালো চড়িদা মুখোশ গ্রাম। চড়িদা বা চোড়দা এখন খুবই জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। কোলকাতা সহ বাংলার মানুষের কাছে যার পরিচিতি ‘মুখোশের গ্রাম’ বলে। প্রখ্যাত ছৌ শিল্পী গম্ভীর সিং মুড়ার সৌজন্যে আজ বিখ্যাত এই চড়িদা গ্রামটা।

'ছৌ' নাচের মুখোশ
'ছৌ' নাচ বা 'ছো' নাচ বা 'ছ' নাচ একপ্রকার ভারতীয় আদিবাসী রণনৃত্য। ছৌ নাচের এরকম নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকমের মত রয়েছে। ড. পশুপতি প্রসাদ মাহাতো ও ড. সুধীর করণের মতে এই নাচের নাম 'ছো', আবার বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত ও ড. বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতোর মতে এই নাচের নাম 'ছ'। আবার ওড়িশার ময়ূরভঞ্জে এই নাচকে ওড়িয়া-উচ্চারণরীতিতে 'ছও' বা 'ছউ' বলে। তবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভের পর এই নৃত্যটা 'ছ' বা 'ছো' নামের পরিবর্তে প্রখ্যাত লোকতত্ববিদ ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য মহাশয়ের দেওয়া 'ছৌ' নামটাই জনপ্রিয় হয়। যদিও তিনি তাঁর বাংলা সাহিত্যের প্রথম সংস্করণে 'ছো' শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। আমাদের কাছে 'ছৌ' নাচের আদি উৎস এই পুরুলিয়া মনে হলেও কিন্তু 'ছৌ'-নাচের উদ্ভব কোথায় ঘটেছিলো তা সঠিক জানা যায়নি। 'ছো' নাচকে মোটামুটি দু'ভাবে ভাগ করা যায় 'পাইক' নাচ এবং 'মুহা' নাচ। পাইক নাচ মূলত যৌথ রণনৃত্য এই নাচে মুখোশ ব্যবহৃত হয় না আর 'মুহা' নাচ মূলত একক নৃত্য এবং এতে মুখোশ ব্যবহার করা হয়। পুরুলিয়া, ধলভূম, ঝাড়গ্রাম অঞ্চলে মুখোশের প্রচলিত নাম 'মুহা' বা 'মহড়া'। এই 'ছো' নাচের পিছনে অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে এটা একটা বিশেষ উৎসবের সঙ্গে যুক্ত। সেই উৎসবটা হলো 'গাজন'। পশ্চিমবঙ্গের ওড়িশা ঝাড়খন্ড সীমান্তবর্তী কোনো কোনো অঞ্চলে এই উৎসবকে বলা হয় 'মাড়ো', 'মাড়ো' কথাটা রূঢ়ি অর্থে গাজন। আবার ওড়িশার ময়ূরভঞ্জে প্রচলিত ওড়িয়া ভাষায় বা সিংভূমের ধলভূম অঞ্চলে অথবা পশ্চিমবঙ্গের গোপীবল্লভপুরের কোনো কোনো অংশে 'ছো' শব্দটার মৌলিক অর্থ 'সং'। গাজনের 'সং' অর্থাৎ গাজনের 'সং' নাচ বললে যা বোঝায়, 'ছো' নাচ বললেও তাই বোঝায়। মূলত এই নাচ ছিল হরপার্বতীর বিবাহ উৎসবকে অনুকরণ করে 'সং' নাচ। গাজনের এই 'সং' নাচই আসলে 'ছো' নাচের ভিত্তিভূমি। 'ছো' নাচের বিশেষত্ব হচ্ছে তার মুখোশ। তবে 'ছো' নাচ শুধু মুখোশ নাচ নয়, মুখোশ ছাড়াও এই নাচ হয়। আগে 'ছৌ' নাচে মুখোশের ব্যবহার ছিল না। মুখে কাপ-ঝাপ মেখে (কালি-ঝুলি) 'আলাদা-ছো' অথবা 'মেল-নাচ' করা হত। গম্ভীর সিং মুড়ার বাবা এবং ঠাকুরদা বিনা মুখোশেই 'ছৌ'-নাচ পরিবেশন করেছেন। তবে এখনকার 'ছৌ' নাচে মুখোশ লাগবেই। এই মুখোশের ব্যবহার এসেছে বাঘমুণ্ডির মুখোশ শিল্পী অবিনাশ সূত্রধর-এর হাত ধরে। 'ছৌ' এর প্রসারের সাথে সাথে মুখোশের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

চড়িদা মুখোশ গ্রাম
রাস্তার দু'পাশে সারি সারি দোকান। নানা ধরণের উজ্জ্বল রঙের মুখোশে সেজে উঠেছে গ্রামটা। প্রতিটি শিল্পীর বাড়ির সামনেই রয়েছে দোকান সেখানেই চলছে মুখোশ তৈরির কাজ, সেখানে মুখোশ বিক্রিও হচ্ছে। আবার ইচ্ছে হলেই দোকানের পাশে রাখা বেঞ্চে বসে মুখোশ বানানোর প্রক্রিয়াও দেখা যেতে পারে। রাস্তার মোড়ে একপাশে গাড়ি রেখে ছৌ মুখোশের মিউজিয়াম দেখতে গেলাম।

ছৌ মুখোশের মিউজিয়াম
চড়িদার এই দোতালা ছোট্ট মিউজিয়ামটিতে প্রবেশ অবাধ। কিভাবে শুরু হয়েছিল এই মুখোশ শিল্প তা জানতে হলে এই মিউজিয়ামে আসা দরকার। প্রায় দেড়শো বছর আগের কথা। বর্ধমান জেলা থেকে কয়েকটা সূত্রধর পরিবার এসে চড়িদা গ্রামে বসতি শুরু করেছিল। ভাদু সহ বিভিন্ন দেবদেবীর মুখোশ গড়িয়ে দেওয়ার শর্তে তৎকালীন বাঘমুণ্ডির রাজা মদনমোহন সিং দেও তাদের থাকার জন্য জমি দিয়েছিলেন। রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হলো এখানে মুখোশ নির্মাণ শিল্প। ছৌ-নাচের মুখোশগুলো শুধু মাটি দিয়ে হয় না। মুখোশ তৈরির মূল উপকরণ দোঁয়াশ মাটি, জল, পুরোন খবরের কাগজ, ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, তেঁতুল বীজের গুঁড়ো, ময়দার আঠা, হলুদ, খড়িগোলা রঙ, বার্নিশ, পুঁতি, জরি, পালক, রাংতা আর নানাবর্ণ রঙের সঙ্গে সাধারণ যন্ত্রপাতি। মাটি গদ, কাগজ চিটানো, কাবিজ লেপা, কাপড় সাঁটান, থাপি পালিশ, খুশনি খোঁচা বা নাক মুখ ও চোখ তীক্ষ্ণ করা এবং সাজানো এই সব প্রক্রিয়ার সাহায্যে গড়ে তোলা হয় মুখোশ। আগে ময়ূরের পালক ব্যবহৃত হলেও এখন তা নিষিদ্ধ। মোটামুটি গণেশ, দুর্গা, শিব, অসুর, মারীচ, শ্রীকৃষ্ণ, হনুমান, মা দুর্গা, ভীম, হিড়িম্বা, রাম-রাবণ, বাঘ-সিংহ, বকাসুর প্রভৃতির আদলে তৈরি হয় এই মুখোশগুলো। আজও প্রাচীন ঐতিহ্যধারা অনুসরণ করে এইসকল মুখোশ তৈরি হচ্ছে। তবে এখন বাজারে চাহিদা থাকায় শিল্পীরা চিরাচরিত মুখোশের পাশাপাশি ঘর সাজানোর জন্যও সাঁওতাল দম্পতির মুখ, নানা পশু-পাখি, ময়ূর এই পদ্ধতিতে তৈরি করছেন। যা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আমরাও বড় রাস্তার ধারে 'দুর্গাচরণ ছৌ মুখোশ সেন্টার' থেকে ঘর সাজানোর জন্য গণেশ ও একজোড়া সাঁওতাল দম্পতির মুখোশ কিনে গাড়িতে চেপে রওনা দিলাম।

একটু মুখোশের আড়ালে
আমাদের গন্তব্য ছিল বাঘমুণ্ডি ব্লকের কালিমাটি মোড়ের কাছে 'বিবেকানন্দ বিকাশ কেন্দ্র' স্কুলটিতে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চড়িদার সীমানা পেরোতেই বদলে গেল চারপাশের পরিবেশ। প্রকৃতি এখানে বেশ রুক্ষ, কেমন যেন একটা হাল্কা মেঠো বুনো গন্ধ। চারদিকে অনুচ্চ টাঁড়, আর সেই রুক্ষ টাঁড়ের মধ্যে পলাশ, তাল আর খেঁজুর গাছ। তবে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে পলাশ। ছোট-মাঝারি-বড় নানান আকারের পলাশ গাছ সারাটা এলাকা জুড়ে। মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্ত ভাবে তাল আর খেজুর গাছ খাড়া হয়ে একাকী দাঁড়িয়ে আছে।

পলাশের দেশে ঢুকে পড়েছি
পলাশ বনের মধ্যে দিয়ে মিশকালো পিচ রাস্তায় গাড়ি ছুটিয়ে চলেছি। একটু দূরে বড় পাহাড় শ্রেণী অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। মাঝে মাঝে দু'চারটে আদিবাসী গ্রাম। রুক্ষতা আর সৌন্দর্যের অপরুপ মিশ্রণ দেখতে দেখতে চলেছি। সঠিক ঠিকানা না জানায় কালিমাটি পেরিয়ে গেলাম। তপোবন মোড় থেকে ঝালদার দিকে কিছুটা যাওয়ার পরই রাস্তার দু'পাশে দেখি একরাশ লাল। শুরু হলো রঙের খেলা। বুঝলাম, পলাশের দেশে ঢুকে পড়েছি। পলাশ মানেই পুরুলিয়া। আর এই পলাশের টানেই ছুটে আসে বহু মানুষ। যেদিকে চোখ যায় শুধুই পলাশ আর পলাশ। যেন রাস্তার দু'পাশে থোকায় থোকায় আগুন লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

পলাশ মানেই পুরুলিয়া
আমাদের গাড়ির সাথে রীতিমতো পাল্লা দিচ্ছে সেই পলাশ গাছের সারি। গাড়িতে তখন গান বেজে চলেছে 'পিঁদাড়ে পলাশের বন, পালাব পালাব মন...'। আর একটু এগোতেই বান্ধডির জঙ্গল। দূরে জারগো বুড়ি পাহাড়। একটা 'বিউটি স্পষ্ট' দেখে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ি। রাস্তা থেকে পাহাড়ের গোড়া পর্যন্ত যতদূর দেখা যায় শুধু লাল পলাশের বন। টাঁড় জঙ্গলের বিরাট এলাকা জুড়ে ছোট-মাঝারি-বড় নানান আকারের পলাশ গাছ। বসম্তকালের শেষ, যেন কেউ পলাশ ফুল বনে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এতো ঘন লাল ভাবা যায় না! পলাশের এই অপরূপ শোভা দেখে মন ভরে গেলো। চোখ খুলে মন ভরে উপভোগ করার পাশাপাশি কিছু ছবিও তুললাম। শুরু হলো আবার এগিয়ে চলা। এরপর জারগো, ইচাগ মোড় পেরিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ঝালদা।

জারগো বুড়ি পাহাড়
ঝালদার বিরসা মোড়ে পৌঁছে বিবেকানন্দ বিকাশ কেন্দ্রের তত্বাধায়ক অরবিন্দ ভট্টাচার্য মহাশয়কে ফোন করলাম। উনি আমাদের জানালেন আমরা স্কুল ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে এসেছি। আমাদের কালিমাটিতে যেতে হবে। অগত্যা কি আর, করি আবার গাড়ি ব্যাক করে ঘুরিয়ে নিয়ে হাওয়ার বেগে ছুটিয়ে চললাম বাঘমুণ্ডির দিকে। যাইহোক পৌঁছে গেলাম কালিমাটির মোড়ে। কালিমাটির মোড় থেকে ডানদিকে টার্ন নিয়ে চলে এলাম বিবেকানন্দ বিকাশ কেন্দ্রে। বাঘমুণ্ডি ব্লকের বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রচুর অসহায়, দুস্থ বাচ্চাদের নিয়ে অরবিন্দ বাবু এই আবাসিক স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি এই অঞ্চলে এরকম আরো কয়েকটা স্কুল তৈরি করেছেন। অতিথি আপ্যায়নের সুন্দর ব্যবস্থা করেছিলেন। আগে থেকেই আমাদের জন্য লাঞ্চের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। সুন্দর ঘরোয়া রান্না। প্রায় ঘন্টা খানেক পরে আবার রওনা দিলাম ঝালদা মোড়ের দিকে। ঝালদা ছাড়িয়ে আমরা এখন বাড়ির পথে। পিছনে পাহাড়ের সারি ফেলে গাড়ি ছুটে চলেছে রাঁচি-পুরুলিয়া হাইওয়েতে। পুরুলিয়া শহরের ভিতর দিয়ে যখন বাঁকুড়ার রাস্তা ধরেছি তখন দুধারের অন্ধকার যেন ঘন হয়ে সরে আসছে কাছে। হুড়ার পরে রাত্রি নামলো। গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে ধলডাঙ্গা বিষ্ণুপুর হয়ে পৌনে এগারোটায় ঘরে ফিরলাম।

পিছনে পাহাড়ের সারি ফেলে গাড়ি ছুটে চলেছে
» প্রয়োজনীয় তথ্য

অযোধ্যা পাহাড়ে বেশ কয়েকটা দ্রষ্টব্য আছে, তবে সেগুলো দেখতে চাইলে একটু সময় নিয়ে বেরোতে হবে। সীতাকুণ্ড, পিপিএসপি আপার ও লোয়ার ড্যাম, মার্বেল লেক, বামনি ফলস, কেষ্ট বাজার ড্যাম, লহরিয়া শিব মন্দির, টুরগা ফলস, টুরগা লেক, ডহরি খাল, পাখি পাহাড়, পারডি লেক, মুরগুমা ড্যাম, ময়ূর পাহাড়, খয়রাবেড়া ড্যাম এবং চড়িদা মুখোশ গ্রাম এগুলো না দেখলে অযোধ্যা পাহাড় ভ্রমণ অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

» থাকার ব্যবস্থা

অযোধ্যা পাহাড়ের হিল টপে এবং পাহাড়ের নীচে বাঘমুণ্ডিতে থাকার জন্য অনেক হোটেল ও লজ আছে। কিন্তু সাধ্যের মধ্যে সেরা ঠিকানা হিল টপে সিএডিসি'র ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স। এখানে কম বেশি বিভিন্ন রেঞ্জের থাকার ব্যবস্থা আছে। নীহারিকা, মালাবিকা, মানসী, মালঞ্চ, অনামিকা, বলাকা, বিভাবরী, উপেক্ষিতা এরকম বিভিন্ন নামের গেস্টহাউস রয়েছে। এছাড়াও তৃষা ও অপরাজিতা দুটো স্যুট আছে। আহারাদির জন্য রয়েছে হিল টপ হোটেল, হিল ভিউ হোটেল, হোটেল পরিবার, জয় শ্রীগুরু হোটেল, জগবন্ধু হোটেলে।

অযোধ্যা হিল টপ
  • সিএডিসি গেস্ট হাউসঃ- +৯১ ৩২৫২২২৫৭২৬, +৯১ ৩৩২২৩৭৭০৪১, +৯১ ৮০০১৯৩৪০৫৮, +৯১ ৭৫০১৫২৪৩৪৫
  • কুশলপল্লী রিসর্টঃ- +৯১ ৯৮৩১২৬০৬০৬, +৯১ ৯৭৩৫১৫১৫১৫
  • অযোধ্যা পাহাড় ইয়ুথ হোস্টেলঃ- +৯১ ৬২৯২২৪৮৮৭০
  • অযোধ্যা হিল টপ টুরিস্ট লজঃ- +৯১ ৯৬৩৫০৭৬০৫৯
  • অযোধ্যা হিল আর্কেডঃ- +৯১ ৯৮৩১৯৭৬৪৫২
  • অযোধ্যা গেস্ট হাউসঃ- +৯১ ৮৩৪৮৬৯৩৪০০, +৯১ ৯৪৩৪০৩৩১৪৫
  • হোটেল পলাশঃ- +৯১ ৯৯৩২৩৪৩৪৫০, +৯১ ৭৭৯৭৬৬৪৪২১, +৯১ ৭৩১৯৮২৯১৮৫
  • ভারত সেবাশ্রম সংঘঃ- +৯১ ৩২৫২২০২৮৯৪, +৯১ ৯৬৩৫১১৪৯৯৮, +৯১ ৯৪৩৪৮৭৭৫৭০
  • বিরস মুন্ডা রিসর্টঃ- +৯১ ৯০০২৪৬২৫৮৯, +৯১ ৭৬৭৯৮৭১৪৩৫
  • আলপনা লজঃ- +৯১ ৭০৪৭৯৭২১৯৩
  • দীপশিখা লজঃ- +৯১ ৯৫৬৪১৬৯৫৯১, +৯১ ৮৯৭২১৩১০৭৯
  • দুর্গা লজঃ- +৯১ ৮০০১৩৯১২২৩
  • পরিবার লজঃ- +৯১ ৮১৫৯৮৫০০৪৪, +৯১ ৯৫৬৪৮৯৩৭০০
  • আলপনা লজঃ- +৯১ ৭০৪৭৯৭২১৯৩
  • পার্বতী লজঃ- +৯১ ৮৬১৭০৫৯৫৩৪, +৯১ ৯৫৯৩৫৪২২৫৪
  • অমিত হোমস্টেঃ- +৯১ ৯৭৩৫৯৩৮৪৩১, +৯১ ৬২৯৪৪৫৭৫০৬
  • সুদীপা হোমস্টেঃ- +৯১ ৮৯৭২৪৩০২৭১, +৯১ ৭৮৬৩৯৭৪১৮৭
  • সান হোমস্টেঃ- +৯১ ৭০৭৬৩০৭৮৩০, +৯১ ৮৯৭২০৮০৫১৭
  • হোটেল হিল কুইনঃ- +৯১ ৯৯৩২৭৯০০১৩
  • বীণাপাণি আবাসনঃ- +৯১ ৭৪৭৭৩৩৩৬১৩
বাঘমুণ্ডি
  • আরণ্যক লজঃ- +৯১ ৯৯৩২৭২৫৫৫৫, +৯১ ৯৭৩২৩৯৪১১৫
  • অযোধ্যা হিল ভিউ লজঃ- +৯১ ৯০০৭৫০৯৯৫৫, +৯১ ৯৮৩০৫১৩০৩৮
  • মানভুম ট্যুরিস্ট লজঃ- +৯১ ৯৭৩৪৭৭৬৮৯৪
  • শুভম ট্যুরিস্ট লজঃ- +৯১ ৮০০১৬৮০৮৫৭, +৯১ ৯৭৭৫৩৮৯০০১
  • কঙ্কা টুরিস্ট লজঃ- +৯১ ৯৭৩২১৩৪৬৫৬
  • রেনুকা লজঃ- +৯১ ৯৬৪৭৫৯৫০৭৩, +৯১ ৯৭৩২০৮৯০৪১
  • শ্রী দুর্গা লজঃ- +৯১ ৯৭৭৫৩৬৩৮৩৩, +৯১ ৯৯৩৩৯০৭৩৪৮
  • হিল পয়েন্ট লজঃ- +৯১ ৯৪৭৪৫১০৭৪৭
  • কল্পনা অযোধ্যা ট্যুরিস্ট লজঃ- +৯১ ৮৯৪৬০০৩১২৫, +৯১ ৯৮০০৯৩৮৯৭১
  • কান্তি লজঃ- +৯১ ৮৯৪৪৯৫৩৬৭৮, +৯১ ৯৭৩২২২৭৬২০, +৯১ ৯০০২৯৪৫১২৭
  • রঘুনাথ টুরিস্ট লজঃ- +৯১ ৮৬১৭৮৮৫৪২৭, +৯১ ৯৬৪৭৬১৩৩৩৯
  • শোভালয় টুরিস্ট লজঃ- +৯১ ৯৭৩৩২৩০৩২২, +৯১ ৭৩৬৩৯৬৩৫২৬
  • ষ্টার লজঃ- +৯১ ৯০০২১১৪৭০১, +৯১ ৯১২৬৯৫০৫০৮
  • অযোধ্যা ফুট হিলসঃ- +৯১ ৯৪৩৪৬৯১২৫০
  • ছৌ-বুরু হোমস্টেঃ- +৯১ ৯৭৩২২৯৪৫১৫, +৯১ ৯৬৩৫৭৭৩৩০১ 
  • অযোধ্যা গেস্ট হাউসঃ- +৯১ ৮৯১০৯৭২০১৪
  • পলাশ কুসুমঃ- +৯১ ৯৭৩৩২৮৩৬৮১
  • অভয়া রেস্ট হাউসঃ- +৯১ ৮৭০৯৩৮০৮০৪, +৯১ ৮৬১৭৬৩০১৫৬
  • পলাশ আবাসনঃ- +৯১ ৭৭৯৭৭৬৬৪৪২১, +৯১ ৮৬১৭৩৪৮৩২৩, +৯১ ৭৩১৯৮২৯১৮৫
  • অম্বিকা রেসিডেন্সিঃ- +৯১ ৯৭৩২০০৬৫৯০
» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল (তথ্যসূত্রঃ- 'অহল্যাভূমি পুরুলিয়া' - দেবপ্রসাদ জানা, 'পুরুলিয়া' - তরুণদেব ভট্টাচার্য্য)
AJODHYA PAHAR, PURULIA, BAGHMUNDI, JHALDA, WEST BENGAL
Continue Reading
Arabinda Pal
0 Comments

You Might Also Like

রাণী শিরোমণির কর্ণগড় ও মহামায়া মন্দির

রাণী শিরোমণির কর্ণগড় ও মহামায়া মন্দির


মেদিনীপুর শহরের কাছে ছোট্ট একটা গ্রাম কর্ণগড়। এই গ্রামেই রয়েছে দ্বিতীয় চূয়াড় বিদ্রোহের নেত্রী 'রাণী শিরোমণির গড়' ও 'মহামায়া মন্দির'। ইতিহাসের টানে বহু পর্যটক ছুটে আসেন এই কর্ণগড়ে। প্রবাদ আছে মহাভারতীয় যুগে কর্ণের অধীনে বর্তমানের বাংলা, বিহার ও ওড়িশার কিছু অংশ নিয়ে এক শক্তিশালী রাজ্য গড়ে উঠেছিল। মেদিনীপুরের নিকটবর্তী কর্ণগড় ছিল এই রাজ্যের রাজধানী। কিন্তু কর্ণ রাজার সাথে এরকম কোনো সম্পর্ক যে নেই তা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। আবার কেউ অনুমান করেন যে, উৎকলাধিপতি কর্ণকেশরী এখানে একটা নগর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কবি সন্ধ্যাকার নন্দীর লেখা 'রাম চরিতম' নামে সংস্কৃত কাব্যে এই কর্ণকেশরীর কথা উল্লেখ আছে। মহামায়ার মন্দিরের গঠন প্রণালী দেখে কেশরী-বংশের রাজা কর্ণকেশরী এখানে নগর প্রতিষ্ঠিত করে মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলে অনুমান করা যেতেই পারে। কেশরী-বংশের সময় উৎকলে বহু দেব-মন্দির, অট্টালিকা ও সুরম্য রাজ-প্রাসাদ প্রভৃতি নির্মিত হয়েছিল। আজও তাদের ধ্বংসাবশেষ নয়নমুগ্ধ করে।

রাণী শিরোমণির গড়ের এই প্রাচীন নিদর্শন দেখতে আসা বহু অনুরাগীদের পাশাপাশি ভক্তির টানেও কর্ণগড়ে মহামায়ার মন্দিরে প্রতিদিন পূজো দিতে আসেন পূণ্যার্থীরা। এই মন্দিরে অনেকে বিবাহ, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, নতুন গাড়ি পুজো ইত্যাদি শুভকার্য অনুষ্ঠান করে থাকেন। মন্দির ছাড়াও জঙ্গল ও নদী দিয়ে ঘেরা কর্ণগড়ের মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও গ্রাম্য পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। বহুবার গিয়েছি এই কর্ণগড়ের মহামায়া মন্দিরে কিন্তু এই প্রথমবার দেখে এলাম রানী শিরোমণির গড়ে সেই ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ।

ভাদুতলা মোড়ের কাছে তোরণ দ্বার
মেদিনীপুর শহর পেরিয়ে ভাদুতলা মোড়ের কাছে ডানদিকে দেখলাম একটা সুদৃশ্য তোরণ। তোরণের দুপাশে রয়েছে চুয়াড় বিদ্রোহের স্মারক হিসেবে তীর-ধনুক হাতে আদিবাসী মূর্তি এবং উপরে মা মহামায়া ও সাধক রঘুবাবার সিমেন্টের তৈরি মূর্তি। এই তোরণ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম কর্ণগড় গ্রামের মহামায়া মন্দিরে।

চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতিসৌধ
উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা চত্বর। ঢোকার পথে রয়েছে মন্দিরের আদলে তৈরি একটা সুন্দর প্রবেশদ্বার, যার স্থাপত্য অভিনব। এটাই এখন মন্দির চত্বরে ঢোকার মূল প্রবেশপথ। মাকড়া পাথরের তৈরি অদ্ভুত এই প্রবেশদ্বারটা যেন একটা তিনতলা মন্দির। প্রবেশদ্বারের উত্তর ও দক্ষিণ দু'দিক দিয়েই সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা যায়। মন্দিরের পূর্ব দিকের প্রবেশদ্বারটা ছিল এককালে প্রধান প্রবেশপথ। জীর্ণ হাওয়ায় ওই দ্বারটা এখন আর প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। এই প্রবেশদ্বারটা 'যোগী ঘোপা' বা 'যোগমন্ডপ' নামে পরিচিত। যে সকল সাধকেরা শক্তি সাধনার জন্য মহামায়া মন্দিরে আসেন তাঁরা প্রথমে এই যোগ মণ্ডপের তিনতলায় বসে যজ্ঞ ও যোগসাধন করে থাকেন।

'যোগী ঘোপা' বা 'যোগমন্ডপ'
যোগমন্ডপের ভিতর দিয়ে ঢুকেই দেখি কর্ণগড়ের অধিদেবতা অনাদিলিঙ্গ ভগবান দণ্ডেশ্বরের মন্দির। এই চত্বরের সবচেয়ে বড় মন্দির এটা। ওড়িশা শৈলীর রেখ-দেউল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। দণ্ডেশ্বর মন্দিরের চূড়ায় বেঁকি, আমলক ও কলস স্থাপিত এবং মন্দিরের বাইরের দেওয়ালের উপরের অংশের চারদিকে চারটে সিংহ ও পিছনের দিকের দেওয়ালের গায়ে শিব-দুর্গা এবং লাঠি হাতে কোনো ভক্তের প্রতিমূর্তি দেখা গেলো। সামনের জগমোহনের মূল চূড়া ছাড়া উত্তর, দক্ষিণ, পশ্চিম দিকে আরও তিনটে চূড়া আছে। দণ্ডেশ্বর বিগ্রহটা কোনও শিবলিঙ্গ নয় তার বদলে একটি কালো পাথরের ভিতরে গভীর গর্ত রয়েছে যা 'যোনিপীঠ' নামে পরিচিত। মন্দিরের ভিতরে রয়েছে খড়্গেশ্বর শিবের একটা কালো পাথরের লিঙ্গ।

মহাবীর মন্দির ও দণ্ডেশ্বর মন্দির
কথিত আছে, খড়্গেশ্বর শিবলিঙ্গটা কবি রামেশ্বর প্রতিষ্ঠা করেন। দণ্ডেশ্বর মন্দিরের দক্ষিণ দিকে মহামায়ার মন্দিরটা একইরকম তবে উচ্চতায় সামান্য একটু ছোট। প্রবাদ, কর্ণগড় রাজবংশের রাজা কর্ণকেশরী এই মন্দির দুটো স্থাপন করেছিলেন এবং তাঁর নাম অনুসারে এই জায়গাটার নাম কর্ণগড়।

মন্দির চত্বর
বগলামুখী মা মহামায়া ও অভয়া মায়ের এই মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি পঞ্চমুণ্ডীর যোগাসন। কর্ণগড়ের খ্যাতনামা রাজা যশোবন্ত সিংহ এবং রাজার সভাকবি শিবায়ণ কাব্যপ্রণেতা রামেশ্বর ভট্টাচার্য মা মহামায়ার মন্দিরে এই পঞ্চমুণ্ডীর আসনে বসেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন।

মা মহামায়া বগলামুখী ও অভয়া মায়ের মন্দির
মহামায়া ও দণ্ডেশ্বর মন্দিরের মাঝে রয়েছে একটা সমতল ছাদের মন্দির। মন্দিরটি যোগমায়া দেবীর। মহামায়া মন্দিরের ঠিক পিছনে সিদ্ধকুণ্ড নামে একটা পবিত্র কুণ্ড আছে। কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে এই কুণ্ডে নামতে হয়। তবে কুণ্ডের জলে নামা সম্পূর্ণ নিষেধ। দণ্ডেশ্বর মন্দিরে শিবের উদ্দেশ্যে ভক্তরা যে জল ও দুধ ঢালেন তা সুড়ঙ্গ পথে এই কুণ্ডে এসে সারা বছর জমা হয় এবং ভক্তরা সেটা চরণামৃত রূপে পান করেন। বছরে একবার এই কুণ্ডটিকে সংস্কার করা হয়। শিবকুণ্ডের কাছে দণ্ডেশ্বর মন্দিরের পিছনে নহবতখানা সহ আরও একটা প্রবেশদ্বার আছে। মাকড়া পাথরের তৈরি এই প্রবেশপথটা একইরকম রাখা আছে। এর ওপরে সিমেন্ট বালির পলেস্তারা নেই।

যোগমায়া মন্দির
দণ্ডেশ্বর মন্দির আর মহামায়া মন্দিরের মধ্যে রয়েছে কল্পতরু মন্ডপ। পুণ্যার্থীরা মনস্কামনা পুরণের জন্য গাছের বদলে এখন পাশে একটা সিমেন্টের খুঁটিতে লাল সুতোয় পাথর বেঁধে ঝুলিয়ে রাখেন। সুন্দর ফুলবাগান ও গাছপালা ঘেরা মন্দির চত্বর। মন্দির চত্বরে রয়েছে মা মহামায়ার সাধক রঘুবাবার মন্দির। দণ্ডেশ্বর মন্দিরের উত্তরে রয়েছে মহাবীর হনুমান মন্দির। আগে এখানে মন্দিরগুলো বেশ খোলামেলা ছিল এবার এখানে এসে দেখি সমস্ত মন্দিরের উঁচু বেদীর চারপাশে স্টীলের রেলিং দিয়ে ঘেরা। কল্পতরু মন্ডপটাও দেখি একটি স্টীলের খাঁচা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

কল্পতরু মন্ডপ
মহাবীর মন্দিরের পাশে প্রাচীরের বাইরে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর। উৎকল শিল্পরীতিতে তৈরি মাকড়া পাথরের এই মহামায়া মন্দির ও দণ্ডেশ্বরের মন্দিরটা আজও অটুট রয়েছে। এই মন্দিরগুলো এমন সুদৃঢ় ভাবে নির্মাণ করা যে যুগযুগান্তরেও বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। নিয়মিত সংস্কারের ফলে মন্দিরগুলোকে কোনোসময়ে দেখে প্রাচীন বলে মনে হয়নি।

মন্দিরের পুকুর

চুয়াড় বিদ্রোহের নেত্রী রাণী শিরোমণির গড়

দেবী মহামায়ার মন্দির দর্শন করে চললাম রাণী শিরোমণির গড়ে। কর্ণগড় গ্রামের ভিতরে মোরাম রাস্তা ধরে চলে এলাম শীর্ণকায়া এক নদীর ধারে। বুকে তার এক ফোঁটা জল নেই। একেবারে শুকনো খটখটে। ভারী সুন্দর তার নাম – 'পারাং'। নদীতে জল না থাকায় হেঁটে খুব সহজেই বাইক নিয়ে পার হয়ে গেলাম। নদী পেরিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর দেখতে পেলাম চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত 'রাণী শিরোমণির গড়' অর্থাৎ দুর্গটি। বর্তমানে এই দুর্গের সামান্য কিছু অংশ ছাড়া আর কোনো অস্তিত্ব নেই। গড়ের মধ্যে একটা পশ্চিমমুখী আটচালা মন্দির পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম। তার পাশে গড়ের স্থাপত্যটি ভেঙে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকতে থাকতে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কেবল গুটিকয় ইঁট-পাথর পড়ে রয়েছে।

গড়বাড়ির ধ্বংসাবশেষ

কর্ণগড়ের ইতিহাস

ষোলো শতকের মাঝামাঝি রাজা সুরথ সিংহ মেদিনীপুরের কর্ণগড় অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের খয়রা রাজা। 'খয়রা' জঙ্গলের উপজাতি, নিচু শ্রেণীর হিন্দু। সুরথ সিংহের দুই সেনাপতির মধ্যে অন্যতম ছিলেন লক্ষণ সিংহ। লক্ষণ সিংহ উড়িষ্যার কেশরী-বংশের তৎকালীন রাজার সহযোগিতায় ষড়যন্ত্র করে সুরথ সিংহকে হত্যা করে এই অঞ্চলের রাজা হয়ে কর্ণগড়ে নিজের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন। লক্ষণ সিংহের উত্তরপুরুষ রাজা রাম সিংহের পুত্র ছিলেন খ্যাতনামা যশোবন্ত সিংহ। রাজা রাম সিংহের সময় বিখ্যাত 'শিবায়ণ' রচয়িতা রামেশ্বর ভট্টাচার্য্য ঘাটালের রাজা শোভা সিংহের অত্যাচারে নিজের জন্মভূমি যদুপুর গ্রাম ছেড়ে কর্ণগড়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং যশোবন্ত সিংহের রাজত্বকালে তাঁর সভাকবি থাকাকালীন 'শিবায়ণ' কাব্যখানা রচনা করেছিলেন। রাজা যশোবন্তের পুত্র অজিত সিংহ ছিলেন কর্ণগড়ের শেষ রাজা। অজিত সিংহের দুই রাণীর মধ্যে এক রাণী হলেন শিরোমণি। ইতিহাসে যিনি চূয়াড় বিদ্রোহের নেত্রী হিসেবে খ্যাত। দ্বিতীয় চুয়াড় বিদ্রোহের মূল পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এই রাণী শিরোমণি।

'রাণী শিরোমণির গড়'
পারাং নদীর কুল ঘেঁষা টিলার উপর ছিল সেই রাণী শিরোমণির গড়। গড়টি সদর ও অন্দর হিসেবে দুটো মহলে বিভক্ত ছিল। গড়ের তিনদিকে জঙ্গল এবং পূর্বদিকে চাষের জমি ছিল। জঙ্গল থেকে পারাং নদী বেরিয়ে গড়ের দু'দিকে প্রবাহিত হয়ে আবার একজায়গায় এসে মিলেছে। ফলে নদীটা পরিখার মত শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে গড়কে রক্ষা করতো।

চারদিক বাঁধানো পুকুর
ভগ্নাবশেষ দেখে অনুমান করা যায় গড়ের ভিতরে রাজবাড়ীটা মাকড়া পাথর এবং ইঁট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। রাজবাড়ী লাগোয়া স্থানে চারদিক বাঁধানো একটা পুকুর এবং তার পাশে আর একটা সরোবরের মধ্যে পাথরের তৈরি দ্বীপের মতো জলহরি দেখতে পাওয়া গেলো।

জলহরি
গড়ের অদূরে চারচালা গঠনের একটা প্রাচীন মন্দিরের ভগ্নাবশেষ লক্ষ্য করা গেলো। মন্দিরের উপরের অংশের চূড়াটা ইঁটের এবং বাকি অংশ মাকড়া পাথর দিয়ে তৈরি। মূল মন্দির ও তার উপরের চূড়াটা এখনো টিকে আছে, তবে চারদিকের ইঁটের তৈরি চালাগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে এবং মন্দিরের চারদিকে বনজঙ্গলে ছেয়ে গেছে। মন্দিরটি কোন দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত হয়েছিল তা জানা যায়নি।

গড়ের পরিত্যক্ত মন্দির
দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা গড়টি জঙ্গল ও আগাছার আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিলো। বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে ঝোপঝাড় সরিয়ে গড়ের সংস্কার করে সৌন্দর্যায়নের কাজ চলছে। চারপাশে সবুজ ক্ষেতের মধ্যে গ্রাম্য পরিবেশে ন'টি কটেজ তৈরি করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

গ্রাম্য পরিবেশে তৈরি কটেজ
কটেজ গুলো বাঁশের দেওয়াল দেওয়া খড় ও টালির ছাউনি দিয়ে তৈরি, দুটি কটেজ আবার আদিম যুগের মতো পাথরের দেওয়াল দিয়ে তৈরি। পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য বসানো হয়েছে প্রচুর পলাশ গাছ। অফবিট জায়গা হিসেবে খুব শীঘ্রই রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে সংযোজিত হতে চলেছে এই 'রানী শিরোমণির গড়'।

পাথরের দেওয়াল দিয়ে তৈরি কটেজ
» প্রয়োজনীয় তথ্য

মহামায়া মন্দিরে অনেকে বিবাহ, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, নতুন গাড়ি কেনার পরে পুজো দেওয়া ইত্যাদি শুভকার্য অনুষ্ঠান করে থাকেন। বিবাহ, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন ইত্যাদি অনুষ্ঠানের লোকজন খাওয়ানোর সম্পূর্ণ ব্যবস্থা মহামায়া সেবা সমিতির তরফ থেকে দায়িত্ব সহকারে পালন করে থাকে। মন্দিরে লোকজন খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হলে আগের দিন অথবা ঐদিন সকাল ৮:৩০ এর মধ্যে গিয়ে কমিটির সাথে যোগাযোগ করতে হবে। নিজে সমস্ত উপকরণ কিনে দিলে পরিষেবা খরচ হিসেবে মাথাপিছু ১০ টাকা করে লাগবে। আর সেবা কমিটিকে সম্পূর্ণ পরিষেবার দায়িত্ব দিলে মাথাপিছু ৪৫ টাকা করে লাগবে। আনুসাঙ্গিক খরচ কিছু লাগবে না। দু চাকার গাড়ি পুজোর জন্য ৫০ টাকা, চার চাকার গাড়ির জন্য ১০০ টাকা এবং বড় গাড়ি পুজো করতে হলে ২০০ টাকা জমা করে মহামায়া সেবা সমিতির কাছে অগ্রিম কুপন সংগ্রহ করতে হবে। বিবাহের অনুষ্ঠানের জন্য মহামায়া সেবা সমিতির কাছে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যাবতীয় তথ্যের প্রমাণপত্রের কপি জমা করে নাম নথিভুক্ত করতে হবে। বিবাহের সময় সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১:৩০ টা এবং বিকেল ৫ টা থেকে সন্ধ্যে ৭ টা পর্যন্ত।

এখানে প্রতিদিন বেলা একটা থেকে খিচুড়ি ভোগ খাওয়ানো হয়, সকাল ৮:৩০ থেকে ৯:৩০ এর মধ্যে সেবা সমিতির অফিসে গিয়ে ভোগের কুপন সংগ্রহ করতে হয়। একটা ভোগের কুপন ৪৫ টাকা। বিশদ জানতে হলে মহামায়া সেবা সমিতির সাথে +৯১ ৯৪৭৫৬৭২৪৯৪ অথবা +৯১ ৯০০২১৪৩২৩৬ মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করুন।

» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল (তথ্যসূত্রঃ- 'পশ্চিমবঙ্গ দর্শন' - তরুণদেব ভট্টাচার্য্য, 'পুরাকীর্তি সমীক্ষা' মেদিনীপুর - তারাপদ সাঁতরা, 'মেদিনীপুরের ইতিহাস' - যোগেশ চন্দ্র বসু)
KARNAGARH, PASCHIM MEDINIPUR, WEST BENGAL
Continue Reading
Arabinda Pal
2 Comments

You Might Also Like

[name=Arabinda Pal] [img=https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEia50rmuKEAcbGUbQKvAbzUmdviiIhm-LeVlsEEdFx_xtGfyvx8O02yFVuJemgswzSA8PoMcN-XW0AcinKr9iq28lHK43Z4TFFyL7pJyGGxLNx9LGn0cLvPz0lUJzNrWBo9n_NyxGLjDII/h120/IMG_2788.jpg] [description=পর্যটক হিসাবে নয়, একজন ভ্রমণকারী হিসাবে বেড়ানোটা আমার কাছে একটা নেশা এবং ফটোগ্রাফিতেও আমার ভীষণ শখ। তাই একজন ভ্রমণকারী হিসাবে আমার এই ব্লগে নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা ও ছবিগুলো যদি আপনাদের ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই আপনাদের মতামত কমেন্টসের মাধ্যমে জানাতে ভুলবেন না।] (facebook=https://www.facebook.com/groups/2071066419824586/user/100002484831922) (twitter=Twitter Profile Url) (instagram=https://www.instagram.com/arabindapal2020/) (bloglovin=Blogvin Profile Url) (pinterest=https://www.pinterest.com/arabindapalbrb/) (tumblr=Tumblr Profile Url)

Follow @Arabinda Pal