Theme Layout

Boxed or Wide or Framed

Theme Translation

Display Featured Slider

Yes

Featured Slider Styles

[Centred][caption]

Display Grid Slider

No

Grid Slider Styles

[style5][caption]

Display Trending Posts

Display Author Bio

Yes

Display Instagram Footer

Yes

Dark or Light Style

Showing posts with label Paschim Medinipur. Show all posts
Showing posts with label Paschim Medinipur. Show all posts
রাণী শিরোমণির কর্ণগড় ও মহামায়া মন্দির

রাণী শিরোমণির কর্ণগড় ও মহামায়া মন্দির


মেদিনীপুর শহরের কাছে ছোট্ট একটা গ্রাম কর্ণগড়। এই গ্রামেই রয়েছে দ্বিতীয় চূয়াড় বিদ্রোহের নেত্রী 'রাণী শিরোমণির গড়' ও 'মহামায়া মন্দির'। ইতিহাসের টানে বহু পর্যটক ছুটে আসেন এই কর্ণগড়ে। প্রবাদ আছে মহাভারতীয় যুগে কর্ণের অধীনে বর্তমানের বাংলা, বিহার ও ওড়িশার কিছু অংশ নিয়ে এক শক্তিশালী রাজ্য গড়ে উঠেছিল। মেদিনীপুরের নিকটবর্তী কর্ণগড় ছিল এই রাজ্যের রাজধানী। কিন্তু কর্ণ রাজার সাথে এরকম কোনো সম্পর্ক যে নেই তা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। আবার কেউ অনুমান করেন যে, উৎকলাধিপতি কর্ণকেশরী এখানে একটা নগর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কবি সন্ধ্যাকার নন্দীর লেখা 'রাম চরিতম' নামে সংস্কৃত কাব্যে এই কর্ণকেশরীর কথা উল্লেখ আছে। মহামায়ার মন্দিরের গঠন প্রণালী দেখে কেশরী-বংশের রাজা কর্ণকেশরী এখানে নগর প্রতিষ্ঠিত করে মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলে অনুমান করা যেতেই পারে। কেশরী-বংশের সময় উৎকলে বহু দেব-মন্দির, অট্টালিকা ও সুরম্য রাজ-প্রাসাদ প্রভৃতি নির্মিত হয়েছিল। আজও তাদের ধ্বংসাবশেষ নয়নমুগ্ধ করে।

রাণী শিরোমণির গড়ের এই প্রাচীন নিদর্শন দেখতে আসা বহু অনুরাগীদের পাশাপাশি ভক্তির টানেও কর্ণগড়ে মহামায়ার মন্দিরে প্রতিদিন পূজো দিতে আসেন পূণ্যার্থীরা। এই মন্দিরে অনেকে বিবাহ, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, নতুন গাড়ি পুজো ইত্যাদি শুভকার্য অনুষ্ঠান করে থাকেন। মন্দির ছাড়াও জঙ্গল ও নদী দিয়ে ঘেরা কর্ণগড়ের মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও গ্রাম্য পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। বহুবার গিয়েছি এই কর্ণগড়ের মহামায়া মন্দিরে কিন্তু এই প্রথমবার দেখে এলাম রানী শিরোমণির গড়ে সেই ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ।

ভাদুতলা মোড়ের কাছে তোরণ দ্বার
মেদিনীপুর শহর পেরিয়ে ভাদুতলা মোড়ের কাছে ডানদিকে দেখলাম একটা সুদৃশ্য তোরণ। তোরণের দুপাশে রয়েছে চুয়াড় বিদ্রোহের স্মারক হিসেবে তীর-ধনুক হাতে আদিবাসী মূর্তি এবং উপরে মা মহামায়া ও সাধক রঘুবাবার সিমেন্টের তৈরি মূর্তি। এই তোরণ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম কর্ণগড় গ্রামের মহামায়া মন্দিরে।

চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতিসৌধ
উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা চত্বর। ঢোকার পথে রয়েছে মন্দিরের আদলে তৈরি একটা সুন্দর প্রবেশদ্বার, যার স্থাপত্য অভিনব। এটাই এখন মন্দির চত্বরে ঢোকার মূল প্রবেশপথ। মাকড়া পাথরের তৈরি অদ্ভুত এই প্রবেশদ্বারটা যেন একটা তিনতলা মন্দির। প্রবেশদ্বারের উত্তর ও দক্ষিণ দু'দিক দিয়েই সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা যায়। মন্দিরের পূর্ব দিকের প্রবেশদ্বারটা ছিল এককালে প্রধান প্রবেশপথ। জীর্ণ হাওয়ায় ওই দ্বারটা এখন আর প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। এই প্রবেশদ্বারটা 'যোগী ঘোপা' বা 'যোগমন্ডপ' নামে পরিচিত। যে সকল সাধকেরা শক্তি সাধনার জন্য মহামায়া মন্দিরে আসেন তাঁরা প্রথমে এই যোগ মণ্ডপের তিনতলায় বসে যজ্ঞ ও যোগসাধন করে থাকেন।

'যোগী ঘোপা' বা 'যোগমন্ডপ'
যোগমন্ডপের ভিতর দিয়ে ঢুকেই দেখি কর্ণগড়ের অধিদেবতা অনাদিলিঙ্গ ভগবান দণ্ডেশ্বরের মন্দির। এই চত্বরের সবচেয়ে বড় মন্দির এটা। ওড়িশা শৈলীর রেখ-দেউল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। দণ্ডেশ্বর মন্দিরের চূড়ায় বেঁকি, আমলক ও কলস স্থাপিত এবং মন্দিরের বাইরের দেওয়ালের উপরের অংশের চারদিকে চারটে সিংহ ও পিছনের দিকের দেওয়ালের গায়ে শিব-দুর্গা এবং লাঠি হাতে কোনো ভক্তের প্রতিমূর্তি দেখা গেলো। সামনের জগমোহনের মূল চূড়া ছাড়া উত্তর, দক্ষিণ, পশ্চিম দিকে আরও তিনটে চূড়া আছে। দণ্ডেশ্বর বিগ্রহটা কোনও শিবলিঙ্গ নয় তার বদলে একটি কালো পাথরের ভিতরে গভীর গর্ত রয়েছে যা 'যোনিপীঠ' নামে পরিচিত। মন্দিরের ভিতরে রয়েছে খড়্গেশ্বর শিবের একটা কালো পাথরের লিঙ্গ।

মহাবীর মন্দির ও দণ্ডেশ্বর মন্দির
কথিত আছে, খড়্গেশ্বর শিবলিঙ্গটা কবি রামেশ্বর প্রতিষ্ঠা করেন। দণ্ডেশ্বর মন্দিরের দক্ষিণ দিকে মহামায়ার মন্দিরটা একইরকম তবে উচ্চতায় সামান্য একটু ছোট। প্রবাদ, কর্ণগড় রাজবংশের রাজা কর্ণকেশরী এই মন্দির দুটো স্থাপন করেছিলেন এবং তাঁর নাম অনুসারে এই জায়গাটার নাম কর্ণগড়।

মন্দির চত্বর
বগলামুখী মা মহামায়া ও অভয়া মায়ের এই মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি পঞ্চমুণ্ডীর যোগাসন। কর্ণগড়ের খ্যাতনামা রাজা যশোবন্ত সিংহ এবং রাজার সভাকবি শিবায়ণ কাব্যপ্রণেতা রামেশ্বর ভট্টাচার্য মা মহামায়ার মন্দিরে এই পঞ্চমুণ্ডীর আসনে বসেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন।

মা মহামায়া বগলামুখী ও অভয়া মায়ের মন্দির
মহামায়া ও দণ্ডেশ্বর মন্দিরের মাঝে রয়েছে একটা সমতল ছাদের মন্দির। মন্দিরটি যোগমায়া দেবীর। মহামায়া মন্দিরের ঠিক পিছনে সিদ্ধকুণ্ড নামে একটা পবিত্র কুণ্ড আছে। কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে এই কুণ্ডে নামতে হয়। তবে কুণ্ডের জলে নামা সম্পূর্ণ নিষেধ। দণ্ডেশ্বর মন্দিরে শিবের উদ্দেশ্যে ভক্তরা যে জল ও দুধ ঢালেন তা সুড়ঙ্গ পথে এই কুণ্ডে এসে সারা বছর জমা হয় এবং ভক্তরা সেটা চরণামৃত রূপে পান করেন। বছরে একবার এই কুণ্ডটিকে সংস্কার করা হয়। শিবকুণ্ডের কাছে দণ্ডেশ্বর মন্দিরের পিছনে নহবতখানা সহ আরও একটা প্রবেশদ্বার আছে। মাকড়া পাথরের তৈরি এই প্রবেশপথটা একইরকম রাখা আছে। এর ওপরে সিমেন্ট বালির পলেস্তারা নেই।

যোগমায়া মন্দির
দণ্ডেশ্বর মন্দির আর মহামায়া মন্দিরের মধ্যে রয়েছে কল্পতরু মন্ডপ। পুণ্যার্থীরা মনস্কামনা পুরণের জন্য গাছের বদলে এখন পাশে একটা সিমেন্টের খুঁটিতে লাল সুতোয় পাথর বেঁধে ঝুলিয়ে রাখেন। সুন্দর ফুলবাগান ও গাছপালা ঘেরা মন্দির চত্বর। মন্দির চত্বরে রয়েছে মা মহামায়ার সাধক রঘুবাবার মন্দির। দণ্ডেশ্বর মন্দিরের উত্তরে রয়েছে মহাবীর হনুমান মন্দির। আগে এখানে মন্দিরগুলো বেশ খোলামেলা ছিল এবার এখানে এসে দেখি সমস্ত মন্দিরের উঁচু বেদীর চারপাশে স্টীলের রেলিং দিয়ে ঘেরা। কল্পতরু মন্ডপটাও দেখি একটি স্টীলের খাঁচা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।

কল্পতরু মন্ডপ
মহাবীর মন্দিরের পাশে প্রাচীরের বাইরে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর। উৎকল শিল্পরীতিতে তৈরি মাকড়া পাথরের এই মহামায়া মন্দির ও দণ্ডেশ্বরের মন্দিরটা আজও অটুট রয়েছে। এই মন্দিরগুলো এমন সুদৃঢ় ভাবে নির্মাণ করা যে যুগযুগান্তরেও বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। নিয়মিত সংস্কারের ফলে মন্দিরগুলোকে কোনোসময়ে দেখে প্রাচীন বলে মনে হয়নি।

মন্দিরের পুকুর

চুয়াড় বিদ্রোহের নেত্রী রাণী শিরোমণির গড়

দেবী মহামায়ার মন্দির দর্শন করে চললাম রাণী শিরোমণির গড়ে। কর্ণগড় গ্রামের ভিতরে মোরাম রাস্তা ধরে চলে এলাম শীর্ণকায়া এক নদীর ধারে। বুকে তার এক ফোঁটা জল নেই। একেবারে শুকনো খটখটে। ভারী সুন্দর তার নাম – 'পারাং'। নদীতে জল না থাকায় হেঁটে খুব সহজেই বাইক নিয়ে পার হয়ে গেলাম। নদী পেরিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর দেখতে পেলাম চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত 'রাণী শিরোমণির গড়' অর্থাৎ দুর্গটি। বর্তমানে এই দুর্গের সামান্য কিছু অংশ ছাড়া আর কোনো অস্তিত্ব নেই। গড়ের মধ্যে একটা পশ্চিমমুখী আটচালা মন্দির পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম। তার পাশে গড়ের স্থাপত্যটি ভেঙে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকতে থাকতে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কেবল গুটিকয় ইঁট-পাথর পড়ে রয়েছে।

গড়বাড়ির ধ্বংসাবশেষ

কর্ণগড়ের ইতিহাস

ষোলো শতকের মাঝামাঝি রাজা সুরথ সিংহ মেদিনীপুরের কর্ণগড় অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের খয়রা রাজা। 'খয়রা' জঙ্গলের উপজাতি, নিচু শ্রেণীর হিন্দু। সুরথ সিংহের দুই সেনাপতির মধ্যে অন্যতম ছিলেন লক্ষণ সিংহ। লক্ষণ সিংহ উড়িষ্যার কেশরী-বংশের তৎকালীন রাজার সহযোগিতায় ষড়যন্ত্র করে সুরথ সিংহকে হত্যা করে এই অঞ্চলের রাজা হয়ে কর্ণগড়ে নিজের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন। লক্ষণ সিংহের উত্তরপুরুষ রাজা রাম সিংহের পুত্র ছিলেন খ্যাতনামা যশোবন্ত সিংহ। রাজা রাম সিংহের সময় বিখ্যাত 'শিবায়ণ' রচয়িতা রামেশ্বর ভট্টাচার্য্য ঘাটালের রাজা শোভা সিংহের অত্যাচারে নিজের জন্মভূমি যদুপুর গ্রাম ছেড়ে কর্ণগড়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এবং যশোবন্ত সিংহের রাজত্বকালে তাঁর সভাকবি থাকাকালীন 'শিবায়ণ' কাব্যখানা রচনা করেছিলেন। রাজা যশোবন্তের পুত্র অজিত সিংহ ছিলেন কর্ণগড়ের শেষ রাজা। অজিত সিংহের দুই রাণীর মধ্যে এক রাণী হলেন শিরোমণি। ইতিহাসে যিনি চূয়াড় বিদ্রোহের নেত্রী হিসেবে খ্যাত। দ্বিতীয় চুয়াড় বিদ্রোহের মূল পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এই রাণী শিরোমণি।

'রাণী শিরোমণির গড়'
পারাং নদীর কুল ঘেঁষা টিলার উপর ছিল সেই রাণী শিরোমণির গড়। গড়টি সদর ও অন্দর হিসেবে দুটো মহলে বিভক্ত ছিল। গড়ের তিনদিকে জঙ্গল এবং পূর্বদিকে চাষের জমি ছিল। জঙ্গল থেকে পারাং নদী বেরিয়ে গড়ের দু'দিকে প্রবাহিত হয়ে আবার একজায়গায় এসে মিলেছে। ফলে নদীটা পরিখার মত শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে গড়কে রক্ষা করতো।

চারদিক বাঁধানো পুকুর
ভগ্নাবশেষ দেখে অনুমান করা যায় গড়ের ভিতরে রাজবাড়ীটা মাকড়া পাথর এবং ইঁট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। রাজবাড়ী লাগোয়া স্থানে চারদিক বাঁধানো একটা পুকুর এবং তার পাশে আর একটা সরোবরের মধ্যে পাথরের তৈরি দ্বীপের মতো জলহরি দেখতে পাওয়া গেলো।

জলহরি
গড়ের অদূরে চারচালা গঠনের একটা প্রাচীন মন্দিরের ভগ্নাবশেষ লক্ষ্য করা গেলো। মন্দিরের উপরের অংশের চূড়াটা ইঁটের এবং বাকি অংশ মাকড়া পাথর দিয়ে তৈরি। মূল মন্দির ও তার উপরের চূড়াটা এখনো টিকে আছে, তবে চারদিকের ইঁটের তৈরি চালাগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে এবং মন্দিরের চারদিকে বনজঙ্গলে ছেয়ে গেছে। মন্দিরটি কোন দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত হয়েছিল তা জানা যায়নি।

গড়ের পরিত্যক্ত মন্দির
দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা গড়টি জঙ্গল ও আগাছার আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিলো। বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে ঝোপঝাড় সরিয়ে গড়ের সংস্কার করে সৌন্দর্যায়নের কাজ চলছে। চারপাশে সবুজ ক্ষেতের মধ্যে গ্রাম্য পরিবেশে ন'টি কটেজ তৈরি করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

গ্রাম্য পরিবেশে তৈরি কটেজ
কটেজ গুলো বাঁশের দেওয়াল দেওয়া খড় ও টালির ছাউনি দিয়ে তৈরি, দুটি কটেজ আবার আদিম যুগের মতো পাথরের দেওয়াল দিয়ে তৈরি। পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য বসানো হয়েছে প্রচুর পলাশ গাছ। অফবিট জায়গা হিসেবে খুব শীঘ্রই রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে সংযোজিত হতে চলেছে এই 'রানী শিরোমণির গড়'।

পাথরের দেওয়াল দিয়ে তৈরি কটেজ
» প্রয়োজনীয় তথ্য

মহামায়া মন্দিরে অনেকে বিবাহ, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, নতুন গাড়ি কেনার পরে পুজো দেওয়া ইত্যাদি শুভকার্য অনুষ্ঠান করে থাকেন। বিবাহ, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন ইত্যাদি অনুষ্ঠানের লোকজন খাওয়ানোর সম্পূর্ণ ব্যবস্থা মহামায়া সেবা সমিতির তরফ থেকে দায়িত্ব সহকারে পালন করে থাকে। মন্দিরে লোকজন খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হলে আগের দিন অথবা ঐদিন সকাল ৮:৩০ এর মধ্যে গিয়ে কমিটির সাথে যোগাযোগ করতে হবে। নিজে সমস্ত উপকরণ কিনে দিলে পরিষেবা খরচ হিসেবে মাথাপিছু ১০ টাকা করে লাগবে। আর সেবা কমিটিকে সম্পূর্ণ পরিষেবার দায়িত্ব দিলে মাথাপিছু ৪৫ টাকা করে লাগবে। আনুসাঙ্গিক খরচ কিছু লাগবে না। দু চাকার গাড়ি পুজোর জন্য ৫০ টাকা, চার চাকার গাড়ির জন্য ১০০ টাকা এবং বড় গাড়ি পুজো করতে হলে ২০০ টাকা জমা করে মহামায়া সেবা সমিতির কাছে অগ্রিম কুপন সংগ্রহ করতে হবে। বিবাহের অনুষ্ঠানের জন্য মহামায়া সেবা সমিতির কাছে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যাবতীয় তথ্যের প্রমাণপত্রের কপি জমা করে নাম নথিভুক্ত করতে হবে। বিবাহের সময় সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১:৩০ টা এবং বিকেল ৫ টা থেকে সন্ধ্যে ৭ টা পর্যন্ত।

এখানে প্রতিদিন বেলা একটা থেকে খিচুড়ি ভোগ খাওয়ানো হয়, সকাল ৮:৩০ থেকে ৯:৩০ এর মধ্যে সেবা সমিতির অফিসে গিয়ে ভোগের কুপন সংগ্রহ করতে হয়। একটা ভোগের কুপন ৪৫ টাকা। বিশদ জানতে হলে মহামায়া সেবা সমিতির সাথে +৯১ ৯৪৭৫৬৭২৪৯৪ অথবা +৯১ ৯০০২১৪৩২৩৬ মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করুন।

» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল (তথ্যসূত্রঃ- 'পশ্চিমবঙ্গ দর্শন' - তরুণদেব ভট্টাচার্য্য, 'পুরাকীর্তি সমীক্ষা' মেদিনীপুর - তারাপদ সাঁতরা, 'মেদিনীপুরের ইতিহাস' - যোগেশ চন্দ্র বসু)
KARNAGARH, PASCHIM MEDINIPUR, WEST BENGAL
Continue Reading
Arabinda Pal
2 Comments

You Might Also Like

বগড়ীর বনদেবী আজ গড়বেতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা

বগড়ীর বনদেবী আজ গড়বেতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা


গড়বেতার এই মন্দিরটি সারা ভারতবর্ষের মধ্যে একমাত্র হিন্দু মন্দির যেটি উত্তরমুখী। মন্দিরটি পীঢ়া দেউল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। এই সর্বমঙ্গলা মন্দির সম্পর্কে নানারকম গল্পগাথা চালু আছে। পূর্বে গড়বেতার এই প্রাচীন জনপদ 'বগড়ী' সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চল জঙ্গলাকীর্ণ ছিল এবং সেখানে উপজাতিরা বসবাস করতো। শিকারই ছিল তাদের প্রধান উপজীবিকা। তারা শিকারে যাওয়ার আগে জঙ্গলে এক বনদেবীর পূজা করতো। অনেকে মনে করেন তাদের সেই বনদেবীকে বগড়ীর প্রথম রাজা গজপতি সিংহ প্রতিষ্ঠিত করে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। এই বনদেবীই পরবর্তীকালে বগড়ীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা নামে পরিচিতা হন। সর্বমঙ্গলা দেবী দুর্গার একটি রূপ। মন্দিরে যাওয়ার রাস্তা ভীষণ সঙ্কীর্ণ। এর আগে একবার ওই রাস্তায় গাড়ি নিয়ে গিয়ে বেকায়দায় পড়েছিলাম, মন্দির দর্শন করতে পারিনি। কিন্তু এবার কোভিডের কারণে রাস্তা ফাঁকা থাকায় সহজেই মন্দির দর্শন করে এলাম।

গনগনি'র পথে... শিহরণ জাগানো সেই গভীর জঙ্গল !!
শুনেছি সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় গনগনির রূপ সবচেয়ে সুন্দর হয়। ফটোগ্রাফির জন্য ওই সময় আদর্শ। তাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল গনগনির সূর্যাস্তের সময় তার সুন্দর রূপ ক্যামেরায় ধরে রাখা। পরিকল্পনা মতো স্ট্যান্ড সহ ক্যামেরা নিয়ে রওনা দিলাম গনগনির উদ্দেশ্যে। এবারেও আমার সঙ্গী উৎপল। ঘন গভীর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে গড়বেতায় যখন পৌঁছায় তখন বিকেল চারটে, সূর্যাস্তের অনেক দেরি।

গনগনিতে স্বাগতম
উৎপলকে বললাম হাতে যখন সময় আছে তাহলে একবার সর্বমঙ্গলা মন্দির দর্শন করে আসি। গড়বেতা বাজার থেকে সহজে পৌঁছানো যাবে এই মন্দিরে। তবে মন্দির পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে যাওয়া গেলেও রাস্তা ভীষণ সঙ্কীর্ণ। এর আগে মন্দির দর্শন করার জন্য ওই রাস্তায় গাড়ি নিয়ে গিয়ে সমস্যায় পড়েছিলাম। তবে এবার কোভিডের কারণে রাস্তা একদম ফাঁকা ছিল, তাই অনায়সে মন্দির পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম। মন্দিরের সামনে ছোট্ট একটা জায়গায় গাড়ি পার্কিং করে পুরোহিতের অনুমতিতে পা রাখলাম মন্দির প্রাঙ্গণে।

দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দির দর্শণ

সর্বমঙ্গলা মন্দিরের সূচনা:

গড়বেতার অন্যতম প্রাচীন কীর্তি ও সেরা আকর্ষণ এই সর্বমঙ্গলা মন্দির। এখানে দেবী পূজিতা হন দুর্গারূপে। মন্দিরটির বৈশিষ্ট এটি উত্তরমুখী। সচরাচর কোনো হিন্দু মন্দিরে এরকম দেখা যায় না। মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। এর সঙ্গে তাল বেতালের গল্প নিয়ে উপকথা জড়িত আছে। গল্পগাথা অনুযায়ী উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমাদিত্যের সময় এক যোগী সাধক এই অঞ্চলে এসেছিলেন। সেই সময় এই জায়গা ছিল শুধুই জঙ্গল। লোকে বলত বগড়ির জঙ্গল। অলৌকিক প্রতিভাধর সেই সাধক উপেন্দ্র ভট্ট তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাবলে বগড়ীর বনপ্রদেশে এই দেবী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এই মন্দিরের মাহাত্ম্যের কথা ধীরে ধীরে বিক্রমাদিত্যের কানে পৌঁছল। রাজা বিক্রমাদিত্য এই অলৌকিক শক্তির কথা শুনে গড়বেতায় দেবীর মন্দিরে এসে পঞ্চমুন্ডি আসনে বসে শব সাধনা শুরু করলেন। সর্বমঙ্গলা মন্দিরে গেলে আজও দেখতে পাওয়া যায় সেই পঞ্চমুণ্ডির আসন। রাজা বিক্রমাদিত্যের সাধনায় দেবী পরিতুষ্ট হয়ে তাঁকে তাল বেতাল নামে অলৌকিক তেজ সম্পন্ন দুই অনুচরের উপর আধিপত্যলাভের অধিকার প্রদান করেন। অর্থাৎ তাল বেতাল সেই মুহুর্ত থেকে রাজা বিক্রমাদিত্যের হুকুম মেনে চলবে। সত্যিই কী বিক্রমাদিত্য সেই ক্ষমতা লাভ করতে পেরেছেন! রাজা তখন নিজের আধ্যাত্মিক শক্তি প্রত্যক্ষ করতে দেবী প্রদত্ত তাল বেতালকে ঐ মন্দির-দ্বার পূর্ব দিক থেকে ঘুরিয়ে উত্তর দিকে পরিবর্তন করতে নির্দেশ দিলেন। আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাল বেতাল মন্দিরের মুখ পরিবর্তন করে উত্তর দিকে করে দেয়। সেই কারণেই সর্বমঙ্গলা দেবীর মন্দিরের দ্বার উত্তর দিকে অবস্থিত বলে প্রচলিত আছে। তবে উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমাদিত্যের এখানে এসে শব সাধনার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আবার অনেকের মতে বগড়ীর প্রথম রাজা গজপতি সিংহ এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন।

সর্বমঙ্গলা মন্দির
কোভিডের কারণে মন্দিরে কোনো লোকজন নেই। আমরা দু'জন ছাড়া মাত্র গুটি চারেক ছোটো বাচ্চা খেলা করছিলো মন্দির প্রাঙ্গনে। মন্দিরের প্রাঙ্গনের ডানদিকে রয়েছে এক বিশাল হাঁড়িকাঠ। কাঠ নয়, সেটি ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা বা লাল মাটির। কথিত আছে আগে এখানে নাকি নরবলি হত। তবে এখন শুধু ছাগল ও মোষ বলি হয়। একসময় মল্লরাজ দুর্জন মল্ল বলি দেওয়া বন্ধ করে দেন। শুরু হয় বৈষ্ণব মতে পূজো। বাংলায় বর্গি আক্রমণের হাত থেকে এই মন্দিরও বাদ যায়নি। বর্গিদের বারেবারে আক্রমণের ফলে নষ্ট হয়েছে মন্দিরের কষ্টিপাথরের আসল মূর্তিটি। পরবর্তীকালে রাজা গজপতি সিংহ মন্দির সংস্কার করে নতুন করে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত করেন।

ছোট্ট বাচ্চাদের সাথে
মন্দিরটি মাকড়া পাথরের তৈরি হলেও বর্তমানে সংস্কার করার ফলে পুরোটাই সিমেন্টের পলেস্তারে ঢাকা। মন্দিরের দেওয়ালের ওপর সম্প্রতি গোলাপি রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। ওড়িশার পীঢ়া দেউল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি মন্দিরটির মোট চারটি অংশ - নাটমন্দির, ভোগমন্দির, জগমোহন এবং দেউল (গর্ভগৃহ)। মূল মন্দিরের বিমান শিখর রীতির। এর সাথে যোগ হয়েছে জগমোহন। গর্ভগৃহের সঙ্গে জগমোহন যুক্ত থাকলে সেটিকে "পীঢ়া রীতি" বলা হয়। জগমোহনের সামনে ছোট্ট যোগমন্ডপ। গর্ভগৃহ থেকে যোগমণ্ডপের ছাদ লহরাযুক্ত, তার উপর বেঁকি। এর পরে নাটমন্দির অংশটি চারচালা। এই অংশটি পরে নির্মিত হয়েছে। মন্দিরের মূল কপাট বন্ধ ছিল তাই দেবীর দর্শন হলো না। মন্দির চত্বরটা ভালো করে ঘুরে দেখে বাইরে থেকে কয়েকটি ছবি তুলে চললাম গনগনির দিকে।

পীঢ়া দেউল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি মন্দির
সর্বমঙ্গলা মন্দির থেকে বেরিয়ে হুমগড়ের রাস্তা ধরে কিছুটা যেতেই কলেজ মোড়ের কাছে চোখে পড়ল একটা সাইনবোর্ড। গাড়ি ডান দিকে ঘুরিয়ে লাল মোরাম রাস্তা ধরে একটু এগুতেই ঘন কাজুর বন। কাজু জঙ্গলের মধ্যে লাল ধুলোর ঘূর্ণি উড়িয়ে আমাদের গাড়ি ছুটতে থাকল গনগনির গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের দিকে। দুপাশে কাজুবাদাম গাছের সারি পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম নদীর ধারে। সামনে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নদী পর্যন্ত। নিচে প্রবল স্রোতে বয়ে যাচ্ছে শিলাবতী নদী। সারাবছর শিলাবতী গা এলিয়ে থাকলেও, ভরা বর্ষায় সে কিন্তু রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। 

সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামা
আমরা সিঁড়ি বেয়ে খাদে নেমে গেলাম। পিছনে জঙ্গলে লাল মাটির সমতল ভূমি আর সামনে খাদ, সেখানে লাল ও গেরুয়া মাটির নানান ভাস্কর্যের অপূর্ব দৃশ্য। খাদের পরে শিলাবতী নদী আর নদীর ওপারে উর্বর চাষ জমি। একদিকে শিলাবতী নদী যেমন ক্ষয় করেছে এই অঞ্চলের ল্যাটেরাইট মৃত্তিকাকে, তেমনই প্রাকৃতিক জলবায়ুও এই ভূমিকে যেন এক দক্ষ শিল্পীর ন্যায় ইচ্ছামতো আকার দিয়েছে এই ভূমিভাগকে।

বর্ষায় গনগনির রূপ
আজ যেন সকাল থেকেই আকাশের মুখভার। মাথার উপরে তাকাতেই নজরে এলো একটু একটু করে আকাশে ভিড় জমাচ্ছে ঘন কালো মেঘের দল। ধীরে ধীরে সূর্যকে গ্রাস করে ফেললো। চারিদিকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। দারুন সুন্দর লাগছিল। ছবি তোলার নেশাতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম একসময়। ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতে  তুলতে দেখলাম অন্ধকার নেমে আসছে। শেষ পর্যন্ত আর দেখা মেলেনি সূর্যের। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলাম তা সফল হলো না। বর্ষায় ভরা শীলাবতীর রূপ দেখে মনকে সান্ত্বনা দিয়ে ইতিউতি কিছুক্ষণ ঘুরে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া চা-য়ে চুমুক দিয়ে হতাশায় ঘরে ফিরলাম। উপরি পাওনা কেবল দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দির দর্শন! সেটাই বা কম কি!

ভরা শীলাবতী
» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল (তথ্যসূত্রঃ- 'মেদিনীপুরের ইতিহাস' - যোগেশচন্দ্র বসু)
SARBAMANGALA MANDIR, GANGANI, GARHBETA, WEST BENGAL
Continue Reading
Arabinda Pal
1 Comments

You Might Also Like

ঐতিহাসিক মন্দিরময় পাথরা

ঐতিহাসিক মন্দিরময় পাথরা


মেদিনীপুর শহর থেকে দশ কিলোমিটার দূরে কংসাবতী নদীর তীরে পাথরা গ্রামটা আজ প্রচারের আলোয় আলোকিত। অখ্যাত এই গ্রামটা এখন আর কারও কাছে অপরিচিত নয়। শ্রদ্ধেয় ইয়াসিন পাঠান মহাশয় এই গ্রামটার জাতীয় পরিচিতি এনে দিয়েছেন। পাথরা মানেই যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐক্যের পীঠস্থান। পাথরায় একসময় বহু মন্দির ছিল। গ্রামের পথের দু'ধারে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য মন্দির-দালানের ধ্বংসস্তূপ। তার মধ্যে চৌত্রিশটা মন্দির এখনো কোনোক্রমে টিকে আছে। এই চৌত্রিশটা মন্দিরের মধ্যে বেশ কয়েকটা মন্দির একসাথে রয়েছে কাঁসাই নদীর পাড়ে, এছাড়া রাসমঞ্চ ও অন্যান্য মন্দির গুলো রয়েছে খানিক দূরে গ্রামের মধ্যে। বর্তমানে এই মন্দিরগুলি সব পরিত্যক্ত, কোনোটাতেই বিগ্রহ নেই এবং পুজোপাঠ হয় না। অসংখ্য মন্দিরের সমাবেশের কারণে এই গ্রামটাকে বলা হয় 'মন্দিরময় পাথরা'। আজও সেখানে গেলে দেখা মেলে আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরানো স্থাপত্য কীর্তি। এখানকার মন্দিরগুলো মূলতঃ পাতলা ইটের তৈরী, এছাড়া মন্দিরগুলোর বিশেষ আকর্ষণ টেরাকোটার প্যানেল বা ফলক।

পাথরার মন্দির

ইতিহাসের পাতায় পাথরা

আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে আনুমানিক ১৭৩২ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার সুবেদার ছিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। সেই সময়ে কংসাবতী নদীর তীরে অবস্থিত এই পাথরা গ্রামটা ছিল রতনচক পরগণার অন্তর্ভুক্ত। তখন আলিবর্দী খাঁর তত্বাবধানে কয়েক হাজার পরগণা ছিল। এই রতনচক পরগণাটাও ছিল আলিবর্দি খাঁর তত্বাবধানে। এই রতনচক পরগণার নায়েব ছিলেন বিদ্যানন্দ ঘোষাল। ধর্মপ্রাণ বিদ্যানন্দ কর আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গুরুর কথায় খাজনার একটা অংশ দিয়ে তিনি একের পর এক মন্দির বানিয়ে যেতে লাগলেন। শিবমন্দির, রাসমঞ্চ থেকে শুরু করে নানা দেবদেবীর মন্দিরে ভরে উঠলো এই রতনচক গ্রাম। মন্দির প্রতিষ্ঠার কারণে বিদ্যানন্দের সুনাম ছড়ালেও তাঁর কাজে নবাব আলিবর্দী খাঁ মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। বার্ষিক খাজনা দেরিতে পৌঁছানোর কারণ নবাবের কানে গিয়ে পৌঁছাল, নবাব জানতে পেরে অত্যন্ত রুষ্ট হন। বিদ্যানন্দকে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারে হাজির করা হয়। সেখানে তাঁকে হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। বিদ্যানন্দকে হাত পা বেঁধে মাঠের মধ্যে পাগলা হাতির সামনে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই পাগলা হাতি বিদ্যানন্দকে পরপর তিনবার পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তাঁকে কিছুতেই আঘাত করেনি। এই আশ্চর্যজনক ঘটনা নবাবের কানে পৌঁছালে নবাব বিদ্যানন্দকে ডেকে পাঠান। বিদ্যানন্দের মুখে তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠার কাহিনী ও গুরুর নির্দেশের কথা শুনে নবাব আলীবর্দী বিস্মিত হয়ে তাঁর আদেশ ফিরিয়ে নেন। এরপর সসম্মানে বিদ্যানন্দকে মুক্তি দিয়ে তাঁকে নায়েব থেকে রতনচক পরগণার জমিদার মনোনয়ন করেন। এর কিছুদিন পর বিদ্যানন্দ মারা যান। এরপর তাঁর পুত্র রত্নেশ্বর এই পরগণার জমিদার হিসেবে নিযুক্ত হন। রত্নেশ্বর তাঁর বাবার স্মৃতিকে চিরদিন অমর করে রাখার জন্য এই পরগণার নাম বদলে নতুন নাম রাখেন পাথরা। কারণ তার পিতা পাগলা হাতির পদতলে পিষ্ট না হয়ে মৃত্যকে উৎরে বেঁচে ফিরেছিলেন। 'পা উৎরা' অর্থাৎ 'পাতরা', অপভ্রংশে পাথরা ! তাই এই নামকরণ।

নবরত্ন কমপ্লেক্স
বিদ্যানন্দের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র এবং পরবর্তী জমিদার রত্নেশ্বর ঘোষাল নবাবের দেওয়া মজুমদার উপাধি ব্যাবহার করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে মজুমদার বংশের কোন উত্তরসূরি না থাকায় পাথরার জমিদারিত্ব পান এই বংশের দৌহিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় বংশ। পরবর্তীকালে তাঁদেরও দৌহিত্র, বংশের সূত্র ধরে এই জমিদারির মালিক হন মুখোপাধ্যায়, ভট্টাচার্য প্রমুখ বংশ। প্রতিটা বংশই এখানে বিভিন্ন সময়ে মন্দির নির্মাণের কাজ চালিয়ে যান। আঠারো শতকের শেষে এই ধনী পরিবার ক্রমশ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র গমন করা শুরু করলে মন্দির নির্মাণ কার্য্য থেমে যায় এবং প্রায় সব মন্দিরই ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়। মন্দিরগুলিতে যথেচ্ছ লুটপাট শুরু হলো। অনেক মন্দির ধ্বংসস্তুপে পরিণত হল। বর্তমানে কোনোরকমে ৩৪ টা মন্দির সেই ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে। অনেক বাধা বিপত্তি সত্বেও পাথরার পাশের গ্রাম হাতিহলকার বাসিন্দা মহম্মদ ইয়াসিন পাঠান মহাশয় মন্দিরগুলো বাঁচানোর জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৯০ সালে তৈরী করেছেন 'পাথরা পুরাতত্ব সংরক্ষণ সমিতি'। তাঁর তত্বাবধানে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া আজ ৩৪ টা মন্দিরের মধ্যে ২৮ টা মন্দির অধিগ্রহণ করেছে। ১৯৯৪ সালে তাঁর এই অসামান্য প্রয়াসের জন্য তাঁকে সরকারের তরফ থেকে কবীর পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কাছারি বাড়ি
রবিবার মানেই একটা ছুটি ছুটি মেজাজ! রবিবার মানেই লং ড্রাইভ! তাই একঘেয়েমি কাটাতে, নতুন জায়গা দেখতে খুব সকালে বাইক নিয়ে একাই বেরিয়ে পড়লাম পাথরার উদ্দেশ্যে। খড়গপুরের চৌরঙ্গী থেকে ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে সোজা বাঁকুড়ার দিকে এগিয়ে গেলাম। মেদিনীপুর শহরের কাছে কাঁসাই নদীর ওপর বীরেন্দ্র শাসমল ব্রীজ পার হয়ে ডান দিকে একটা ইউ টার্ন নিলাম। হাইরোড থেকে নীচে নেমে মেদিনীপুর শহরে ঢোকার আগে পড়লো ক্ষুদিরাম পার্ক। জায়গাটার নাম আমতলা। ডান দিকের পথটা মেদিনীপুর শহরে আর বাম দিকের পথটা গিয়েছে পাথরা গ্রামে। আমতলা মোড় থেকে চুয়াডাঙ্গা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম হাতিহলকা গ্রামের কদমতলা বাজারে। বাজার ছাড়ার পর বাম দিকে একটা মোড় নিয়ে ঢুকে পড়লাম পাথরার রাস্তায়। কদমতলা বাজার পর্যন্ত রাস্তা বেশ ভালই ছিল, কিন্তু হাতিহলকা থেকে পাথরা এই দু'কিলোমিটার রাস্তা ভীষণ ভাঙাচোরা। পিচের রাস্তা তৈরির কাজ চলছে, যাক তাহলে পরের বার এলে আর কোনো অসুবিধা হবে না। গ্রামে ঢোকার মুখে কলাইচন্ডী খাল, যা মিশেছে কাঁসাই নদীতে। পাথরার পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে এই কাঁসাই নদী। কলাইচন্ডী খালের ব্রীজ পেরিয়ে এগিয়ে যেতেই ডানদিকে চোখে পড়লো সেই কাঁসাই নদী। নদীর চরে ধান ক্ষেত, সব্জির ক্ষেত এছাড়া গ্রামের ভেতর পুকুর, বাঁশঝাড় সবকিছু মিলিয়ে শহুরে জীবন থেকে বেরিয়ে এমন অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই গ্রামটাতে কিছুক্ষণের জন্য হলেও যেন প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।

চলে এলাম ঐতিহাসিক পাথরায়
কাঁসাইয়ের বাঁধের ওপর ভাঙাচোরা লালমাটির মোরামের পথ ধরে চলতে চলতে একসময় পৌঁছে গেলাম মন্দিরময় পাথরায়। পাথরার মন্দিরগুলোকে মূলত পাঁচটা কমপ্লেক্সে ভাগ করা হয়েছে। ধর্মরাজ কমপ্লেক্স, নবরত্ন কমপ্লেক্স, কালাচাঁদ কমপ্লেক্স, শীতলা কমপ্লেক্স আর রাসমঞ্চ কমপ্লেক্স। এছাড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো বেশ কিছু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে এখানে।

'মন্দিরময় পাথরা'
গ্রামের ভেতর একেবারে শুরুতে দেখি রাস্তার দুপাশে ছোট বড়ো বেশ কিছু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, বাঁ দিকে কালাচাঁদ কমপ্লেক্স আর ডান দিকে নবরত্ন কমপ্লেক্স। রাস্তার একপাশে বাইকটা দাঁড় করে প্রথমে গেলাম নবরত্ন কমপ্লেক্সে। নবরত্ন কমপ্লেক্সের প্রধান আকর্ষণ হল পাথরার সবচেয়ে বড়ো এই নবরত্ন মন্দিরটা। কথিত আছে যে মন্দিরটা অভিশপ্ত তাই এই মন্দিরে কখনও পূজা আর্চা হয়নি। মন্দিরের ভেতরের দেওয়ালে বেশ কিছুটা পঙ্খের কাজের নমুনা দেখা গেল। থামের গায়ে ও উপরে বাইরের দেওয়ালে টেরাকোটা কাজের কিছু নমুনা এখনো রয়েছে। যা দেখে বোঝা গেল একসময়ে এই মন্দিরের গায়ে প্রচুর টেরাকোটার কাজ ছিল। মন্দির সংস্কারের সময়ে এগুলো প্লাস্টারে ঢাকা পড়ে গেছে। এই নবরত্ন মন্দিরের ডান দিকে, রাস্তার ধারে দুই দ্বার বিশিষ্ট, সমতল ছাদের তিনটে শিবালয় আছে, যাদের গায়ে এখনও সামান্য পঙ্খের কাজ রয়ে গেছে। এই কমপ্লেক্সে শিবালয়গুলোর পেছন দিকে, রাস্তার একদম ধারে একটা সুন্দর তুলসীমঞ্চ আছে।

নবরত্ন মন্দির ও শিবমন্দির
নবরত্ন মন্দিরের পাশ দিয়ে একটা পায়ে চলা পথ নেমে গেছে নদী পর্যন্ত। আর সেই রাস্তার ডান দিকে ক্ষেতের মধ্যে একেবারে কাঁসাই নদীর ধারে একলা দাঁড়িয়ে রয়েছে এক পঞ্চরত্ন শৈলীর মন্দির। নবরত্ন মন্দির থেকে বেরিয়ে ক্ষেতের আল পথ দিয়ে হেঁটে চলে এলাম সেই ধর্মঠাকুরের মন্দিরে যা ধর্মরাজ মন্দির নামে পরিচিত। এখানে নিয়মিত পুজো অর্চনা হয়। মন্দিরের পাশ দিয়ে বইছে কাঁসাই নদী। এই পঞ্চরত্ন মন্দিরটা সংস্কার করা হয়েছে। দক্ষিণমুখী এই মন্দিরের সামনে তিনটে খিলান প্রবেশপথ রয়েছে। মন্দিরে পঙ্খের কিছু কাজ দেখা গেলেও টেরাকোটার অলঙ্করণগুলো প্লাস্টারে সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে।

ধর্মরাজ মন্দির
নবরত্ন কমপ্লেক্সর ঠিক উল্টো দিকে কালাচাঁদ কমপ্লেক্স। ধর্মরাজ মন্দির থেকে মেন রাস্তায় ফিরে এসে আরো কিছুটা এগিয়ে চলে এলাম কালাচাঁদ কমপ্লেক্সে। এই কালাচাঁদ কমপ্লেক্সের ছোটো মাঠ মতন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেকগুলো মন্দির আছে। এর মধ্যে রাস্তার একদম পাশে রয়েছে একটা সাদামাটা সমতল ছাদবিশিষ্ট দালান রীতির নাটমন্দির। এই মন্দিরটা সম্পূর্ণভাবে সংস্কার করা হয়েছে। পাঁচ খিলানের এই মন্দিরের গায়ে কোনো কারুকার্য নেই। একসময় এই মন্দিরে লক্ষী জনার্দন এবং কালাচাঁদ ঠাকুর পূজিত হতেন। লক্ষী জনার্দন এবং কালাচাঁদের মূর্তিগুলো এখান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন এখানে পুজোপাঠ হয় না। 

কালাচাঁদ মন্দির
কালাচাঁদ মন্দিরের পিছনে দেখতে পেলাম একটা পঞ্চরত্ন শৈলীর শিব মন্দির। উঁচু ভিতের উপরে তৈরি এই মন্দিরের গায়ে অনেকটা উপরে কিছু টেরাকোটা মূর্তির ফলক দেখা গেল। মন্দিরের একদিকের দেওয়ালে দেখা গেল এক রমণী এক পাল্লা বন্ধ দরজা দিয়ে উঁকি মারছেন। এই মন্দিরে অলঙ্করণ বলতে এটুকুই। খড়খড়ি দেওয়া আধখোলা দরজার সামনে দাঁড়ানো এই নারীমূর্তি হল ‘দ্বারবর্তিনী’ মূর্তি। এই মূর্তিটা যথেষ্ট বড় এবং মন্দিরের যে পাশের দেওয়ালে এই মূর্তি সেখানে আর অন্য কোন মূর্তি নেই, তাই স্বাভাবিকভাবেই এটা বেশী করে চোখে পড়ে। এ অঞ্চলে ঝাড়েশ্বর মন্দিরে গিয়েও দেখেছিলাম এরকম নারীমূর্তি। মেদিনীপুর জেলা জুড়ে সেই সময়ে তৈরি অনেক মন্দিরেই এই দ্বারবর্তিনী মূর্তি দেখা যায়।

পঞ্চশিব মন্দির
কালাচাঁদের দালানের পিছনে একদিকে যেমন পঞ্চরত্ন শিবমন্দির রয়েছে, ঠিক তেমনই অন্যদিকে অর্থাৎ ওই পঞ্চরত্ন মন্দিরের উল্টোদিকে উঁচু ভিতের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনটে আটচালা শিব মন্দির। মন্দিরগুলো গায়ে গায়ে ঠেকানো। একেবারে ডানদিকের মন্দিরে রয়েছে একটা প্রতিষ্ঠাফলক। সেখানে লেখা রয়েছে শকাব্দ ১৭৭১, সন ১২৫৫ সাল। অর্থাৎ এই মন্দিরগুলো তৈরি হয়েছিল ইংরেজি ১৮৫০ সাল নাগাদ। মন্দিরগুলোর গায়ে টেরাকোটা ফলক রয়েছে ঠিকই তবে সেগুলোর বেশিরভাগই ক্ষয়ে এসেছে।

আটচালা শিব মন্দির
এখানে এই ডানদিকের আটচালা শিব মন্দিরের একদম পাশেই রয়েছে চুন সুরকি আর পোড়ামাটির ইট দিয়ে তৈরি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত একটা দোতলা বাড়ির কিছু অংশ। এর ভেতরে একটা সিঁড়িও আছে, সেই সিঁড়ি দিয়ে অতি সাবধানে পা ফেলে এখনো দোতলায় ওঠা যায়। এই দোতলা বাড়িটা কিসের সেটা বোঝা গেল না। এই বাড়িটা থেকে একটু দূরেই রয়েছে মাকড়া পাথরে তৈরি একটা ভাঙা দুর্গামন্ডপ। হতে পারে এটা সেই ভেঙে পড়া ঠাকুরদালানের কোনো অংশ। যাকে মন্দির বাড়ি বলা যেতে পারে। এই মন্দির বাড়ি থেকে দুর্গাদালানের মাঝে হয়তো কিছু ছিল। যার চিহ্ন বলতে শুধুই মাটির সঙ্গে মিশে থাকা কয়েকটা ইটের টুকরো। হতে পারে শিবমন্দির থেকে দুর্গামণ্ডপ যাওয়ার জন্য কোনও ঢাকা বারান্দা ছিল! মন্দিরের কোন থামের অস্তিত্ব এখন আর নেই, কিন্তু অনেকগুলো পাথরের থামের তলার অংশ দেখে মনে হল এগুলো সেই বারান্দার থামেরই ধ্বংসাবশেষ।

মন্দির বাড়ি
এর পরেই আসি মন্দির বাড়ির পাশেই গায়ে লাগোয়া দুর্গামন্ডপে। এটা একটা সমতল ছাদের দালান মন্দির। দক্ষিণমুখী এই মন্দিরের ছাদ এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এই কমপ্লেক্সের সবচেয়ে চমকপ্রদ মন্দির হল এই দুর্গাদালান। মূল মন্ডপটা বেশ বড় এবং চওড়া, এক খিলানের প্রবেশপথের দু'দিকেই গোলাকার থাম আর তার উপর খোদাই করা ঝালরের মতন নকশা। এছাড়া বাইরের ও ভেতরের দিকে দেওয়ালের গায়ে অনেকগুলো কুলুঙ্গী। এক সময় এই মন্দিরে ধুমধাম করে দুর্গাপূজা পালিত হত। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসতো এখানে। সেই জাঁকজমক আর নেই। এখন মন্দিরের দেওয়ালগুলো কেবল অতীতের স্মৃতি বুকে নিয়ে একলা দাঁড়িয়ে আছে।

দুর্গামণ্ডপ
এগুলো ছাড়া আরো দুটো শিবমন্দির আছে এই কালাচাঁদ কমপ্লেক্সে। দুর্গাদালান পেরিয়ে বড় রাস্তা ধরে গ্রামের রাস্তার দিকে কিছুটা যেতেই দেখা গেল মাঠের মধ্যে দুটো অর্ধপ্রোথিত শিব মন্দির। একটা পঞ্চরত্ন শৈলীর ও অন্যটা আটচালা রীতির। মন্দির দুটোর অবস্থা অনেকটাই ভাল। পঞ্চরত্ন মন্দিরটা তিন খিলানের, সেই খিলানের ওপরে অনেক জায়গায় পঙ্খের কাজ এখনো রয়েছে। চুন, বালি, চিটেগুড়, পাকা কলা, জায়ফল, হরিতকী, খয়ের, সুরকিগুড়ো, শাঁখ, ঝিনুকের মিহি গুঁড়ো ইত্যাদি মিশিয়ে তৈরী হতো পঙ্খ। এই মিশ্রণ দিয়ে মন্দির গাত্রে নকশা আঁকা হতো। মন্দিরের দুপাশের প্যানেলে ও কার্ণিশে বেশ কিছু টেরাকোটার ফলক এখনও রয়েছে।

কালাচাঁদ কমপ্লেক্সে পঞ্চরত্ন শিব মন্দির
এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে সাদামাটা একটা আটচালা শিব মন্দির। এই আটচালা মন্দিরের গায়ে বেশী কাজ না থাকলেও মন্দিরটা কিন্তু আপেক্ষিক ভাবে অনেক মজবুত। মাটি খুঁড়ে মন্দিরগুলোকে বের করা হয়েছে বলে এগুলো এখনো মাটির খানিকটা তলায়। একটা ছোট্ট সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা নীচে নেমে দেখতে পেলাম মন্দিরের প্রবেশপথ। মন্দিরগুলো থেকে একটু দূরে আরো একটা মন্দির চোখে পড়ল। সেটা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রত্ন শৈলীর সেই মন্দিরের একটা চূড়ার মাথাটুকুই শুধু দেখা যাচ্ছে, বাকিটা মাটির নীচে প্রোথিত, তাই মন্দিরের ভিতের উচ্চতা বিচার করলে মনে হয় এটাই এই কমপ্লেক্সের সবচেয়ে প্রাচীন মন্দির।

আটচালা রীতির শিব মন্দির
কালাচাঁদ কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে একটু এগিয়েই বাঁদিকে একটা রাস্তা চলে গেছে গ্রামের ভেতরে। সেই রাস্তা পেরিয়ে আর একটু সোজা গিয়ে বাঁহাতে পড়ল একটা ছোট মন্দির। পাথরা গ্রামের বন্দোপাধ্যায়দের এই শীতলার মন্দিরটা বুড়িমার থান হিসেবেই পরিচিত। এখানে এখন শীতলা দেবীর নিত্য পূজো হয়। উড়িষ্যার দেউল রীতিতে তৈরি এই গোলাপী রঙের মন্দিরটা নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। এটাও যে এই এলাকার একটা প্রাচীন মন্দির তা দেখে বোঝায় গেল না। মনে হল এটা একেবারে একটা নতুন ও আধুনিক মন্দির। এই মন্দিরের প্রাচীন বৈশিষ্ট্য বলতে শুধু মন্দিরের প্রবেশ পথের চারপাশে প্রাচীন কিছু ফলক ও নকশা এখনো রয়েছে। তবে, সেগুলোর ওপরেও মন্দিরের বাকী অংশের সঙ্গে মিলিয়ে গোলাপী রং করা হয়েছে, ফলে তার প্রাচীনত্ব এখন আর সেভাবে বোঝা যায় না।

শীতলা মন্দির
শীতলা মন্দির থেকে একটু পিছনে এসে বড় রাস্তা ছেড়ে গ্রামের ভেতরে যাওয়ার রাস্তা। সেই গ্রামের রাস্তা ধরে একটুখানি এগিয়েই বাঁহাতে চোখে পড়লো একটা পুরোনো মন্দির। বাড়ির উঠোনের মধ্যে দিয়ে গিয়ে পৌঁছালাম সেই মন্দিরের কাছে। বড় বড় গাছগাছালির মধ্যে ঢাকা এই পঞ্চরত্ন মন্দিরটা সর্বমঙ্গলা মন্দির। মন্দিরের সামনের অংশে রয়েছে তিনটে খিলান, যার মধ্যে মাঝের খিলানটা মন্দিরের প্রবেশপথ এবং পাশের খিলান দুটো দেওয়াল দিয়ে বন্ধ করা আছে। এই মন্দিরেও মাঝের খিলানের ওপর পুরোনো পঙ্খের কাজ এবং দুপাশের প্যানেলে আর ওপরদিকে কিছু টেরাকোটার ফলক এখনও রয়েছে। মন্দিরে কোন বিগ্রহ নেই।

সর্বমঙ্গলা মন্দির
সর্বমঙ্গলা মন্দিরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলেছি। গ্রামের পথ, একটু উঁচু নিচু, দুদিকে গাছের সারি। একটুখানি যেতেই দেখি রাস্তাটা দুটো ভাগ নিয়েছে। ঠিক করতে পারলাম না কোন দিকে যাব। রাস্তার মোড়ে একটা ছোট্ট দোকানে গিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি হাত তুলে একটা রাস্তা দেখিয়ে বললেন এটা দিয়ে চলে যান। গ্রামের সরু রাস্তা। গাছ গাছালিতে ঘেরা, মাঝে মাঝেই গ্রামের বাড়ী, কোনটা মাটির, কোনটা বা পাকা। বড় গাড়ী চলবেনা এই রাস্তায়। কিছুদূর পর্যন্ত গিয়েই রাস্তা শেষ। বাকিটুকু মেঠো পথ। ব্যস! আর রাস্তা নেই। এই জায়গাটা রাসমঞ্চ কমপ্লেক্স নামে পরিচিত। এখানে ডানদিকে চোখে পড়লো তিনটে মন্দির। পাশাপাশি, কিন্তু আলাদা আলাদা উঁচু ভিতের ওপর স্থাপিত। সবগুলো মন্দিরই একই আকার এবং উচ্চতার।

রাসমঞ্চ কমপ্লেক্সে পঞ্চরত্ন শিব মন্দির
পঞ্চরত্ন শৈলীতে তৈরি এই তিনটে শিব মন্দির বন্দোপাধ্যায়রা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠা লিপি থেকে জানা যায় ১৭৩৮ শকাব্দে অর্থাৎ ১২২৪ সনে এই তিনটে মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। প্রতিটা মন্দিরেই শিবলিঙ্গ আছে। মন্দির তিনটের সামনের অংশে ও দুপাশে বেশ কিছু টেরাকোটা কাজ ও পঙ্খের সূক্ষ্ম নকশা এখনো রয়েছে। প্রতিটা মন্দিরের প্রবেশপথের দুপাশে অলঙ্কৃত মূর্তি রয়েছে যা দ্বারপালক (দ্বাররক্ষক) নামে পরিচিত। এই দ্বাররক্ষীদের তিনযুগের তিনরকম পোশাকে দেখা যায়। উত্তরদিকের প্রথম মন্দিরে যে দ্বারপালক রয়েছে তার হাতে রয়েছে লাঠি, পরের মন্দিরের দ্বারপালকের হাতে বন্দুক আর শেষের মন্দিরের দ্বারপালকের হাতে তলোয়ার। এই তিনটে মন্দিরে এখনো গ্রামের লোক পূজার্চনা করে থাকেন।

দ্বাররক্ষক
এই তিনটে মন্দির ছাড়িয়ে আর একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম বাঁহাতে একটা খোলা জমি আর তারই একপাশে একটা দোতলা পরিত্যক্ত বাড়ি। এটা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কাছারি বাড়ি। একেবারেই ভাঙাচোরা। শুধু কাঠামোটা পড়ে আছে। বাড়ীর বাইরেটা অক্ষত থাকলেও ছাদ এখন আর নেই। ভেতরে পুরো আগাছার জঙ্গলে ভর্তি। জানালা, দরজাও উধাও হয়ে গেছে। এই বাড়ীর পাশেই দেখা গেলো একটা ছোট সমতল ছাদের দালান আকৃতির শিবমন্দির। ভেতরের শিবলিঙ্গ এখনও রয়েছে। শিবলিঙ্গের মাথায় একটা টগর ফুল রাখা। মনে হলো এখনো পূজা আর্চা হয়ে থাকে এই মন্দিরে।

বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কাছারি বাড়ি
কাছারি বাড়ির সামনে উঁচু বেদীর ওপর একটা আট কোণা রাসমঞ্চ আছে। এই রাসমঞ্চে মোট নটা চূড়া রয়েছে। পুরো চূড়াটা দেখতে ওল্টানো পদ্মের মতো। এরকম বেহারি রসুন চূড়া শৈলির রাসমঞ্চ খুবই কম দেখা যায়। এর প্রতিটা স্তম্ভের গায়ে টেরাকোটা ও পঙ্খের সূক্ষ্ম নকশা রয়েছে। আট কোণা বিশিষ্ট এই রাসমঞ্চের আটটা কোণেই রয়েছে পেখম তোলা ময়ূরের মূর্তি। প্রতিটা দরজার দুপাশে দ্বারপালিকা দিয়ে সুশোভিত। রাধিকার সখিরা এখানে দ্বারপালিকার ভূমিকায় রয়েছে। বেশিরভাগ মূর্তিই এখন দেখা যায় না কেবল অনুমান করতে হয়। ঘোরা শেষ, বাইকে স্টার্ট দিলাম। পাথরার ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে পিছনে ফেলে সুন্দর একটা স্মৃতি নিয়ে ক্রমশ বাড়ির দিকে এগিয়ে চললাম। ভবিষ্যতে হয়ত এগুলো নিয়েই স্মৃতিচারন করতে হবে।

রাসমঞ্চ
» প্রয়োজনীয় তথ্য

পাথরায় খাবারের কোনো দোকান নেই। তাই খাবার ও জল সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ভালো। হাতিহলকা বাজার ছাড়া কাছাকাছি সেরকম দোকানপাট নেই। শীতকাল এখানে ঘোরার জন্য আদর্শ।

» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল (তথ্যসূত্রঃ- ‘মন্দিরময় পাথরার ইতিবৃত্ত’ - ইয়াসিন পাঠান)
PATHRA, PASCHIM MEDINIPUR, WEST BENGAL
Continue Reading
Arabinda Pal
1 Comments

You Might Also Like

কানাশোলের ঝাড়েশ্বর শিব মন্দির

কানাশোলের ঝাড়েশ্বর শিব মন্দির


লকডাউনের ঠিক আগের সপ্তাহে নতুন ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনে আনার পরে ছবি তোলার সুযোগ পায়নি। অরিন্দমের সাথে ক্যামেরা কিনতে গিয়েছিলাম। অফিসে আড্ডার সময় একবার জিজ্ঞেস করলো নতুন ক্যামেরায় কেমন ছবি তুলছো? জবাবে আমি জানালাম; সুযোগ পেলাম কোথায়। তখনই দুজনে ঠিক করলাম আজ অফিস শেষে ছবি তুলতে বেরিয়ে পড়বো, কিন্তু যায় কোথায়? শুনেছি কাছেই আনন্দপুরে ঝাড়েশ্বর শিবের মন্দির আছে। সেখানে কোনোদিন যাওয়া হয়নি। অরিন্দমকে আমি বললাম, চলো একটু ঘুরে আসি। বেশ কিছু ছবি তোলা যাবে। সে শুনে বললো হুম! প্ল্যানটা মন্দ নয়। রাজি হয়ে গেলো আমার সাথে যেতে। অফিস শেষে দুজনে ক্যামেরা সঙ্গে নিয়ে বাইকে চেপে বেরিয়ে পড়লাম ঝাড়েশ্বর মন্দিরের উদ্দেশ্যে।

গ্রামের দোতালা মাটির বাড়ি
আনন্দপুর আর পাঁচটা গ্রামের মতোই সাধারণ ছোট্ট একটা গ্রাম। এই গ্রামেই অবস্থিত বাবা ঝাড়েশ্বরের মন্দির। মহাদেব এখানে ঝাড়েশ্বর রূপে পূজিত হোন। পঞ্চরত্ন শৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরের সাথে জড়িয়ে আছে বাবা ঝাড়েশ্বরের মাহাত্ম্যের কথা। অরিন্দমের সাথে চলে এলাম আনন্দপুর। বাজার পেরিয়ে সখিশোলের দিকে প্রায় দু-কিলোমিটার যাওয়ার পরে বাঁয়ে একটা তোরণ দ্বার দেখা গেলো। তোরণ দ্বার পেরিয়ে চলে এলাম মনোরম গ্রাম্য পরিবেশে ঘেরা ঝাড়েশ্বর শিব মন্দির চত্বরে। পশ্চিম মেদিনীপুরের আনন্দপুর থানার কানাশোলের এই ঝাড়েশ্বর শিব মন্দিরটি সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি প্রাচীন। মন্দিরটি এই এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। মন্দিরের সামনে রয়েছে পুণ্যার্থীদের বসার একটি ঘর।

পুণ্যার্থীদের বসার ঘর
মন্দিরের ঠিক পিছনেই রয়েছে একটি বিশাল দীঘি। যাকে বলা হয় 'আলাল দীঘি'। এই দীঘিতে ডুব দিয়েই ঘটে জল ভরে শিবের মাথায় ঢালেন ভক্তরা। ভক্তদের বিশ্বাস এই দীঘির জলে স্নান করলে রোগ মুক্ত হওয়া যায়। পূর্বে এই অঞ্চলটি ব্রাক্ষ্মণভূম পরগনার অন্তর্গত ছিল। ঝাড়েশ্বর শিবের আবির্ভাবের পর তৎকালীন ব্রাক্ষ্মণভূমের রাজা আলালনাথ দেব এই দীঘির খননকার্য শুরু করেন। সেই কারণে রাজা আলালনাথ দেবের নাম অনুসারে এই দীঘিটি 'আলাল দীঘি' নামে পরিচিত।

আলাল দীঘি
আলাল দীঘির মধ্যে মাকড়া পাথরের একটি 'জলহরি' মন্দির রয়েছে, যেটি এখন লুপ্তপ্রায়। আলালনাথের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই নদীয়াল দেব তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে দীঘির মধ্যে 'জলহরি' মন্দিরটি নির্মান করেন।

জলহরি
বট গাছের ছায়ায় ঘেরা শান্ত শীতল পরিবেশে মন্দির চত্বরটি বেশ মনোরম। প্রতিদিন প্রচুর পুণ্যার্থী এখানে ভিড় করেন। মন্দিরের সামনে ফুলের মালা, পসরা সাজিয়ে বসা একটি দোকান রয়েছে। অরিন্দমকে সাথে নিয়ে দারুন আগ্রহ নিয়ে মন্দিরের চারপাশটা দেখতে লাগলাম। মন্দিরের সামনে আর দুই পাশে তিন খিলানের বারান্দা। জুতো খুলে সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে উঠে এলাম মন্দিরের বারান্দায়। মন্দিরের ভেতরে দূরত্ব বজায় রেখে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে এখানে পূজার্চনা চললেও এখন মন্দির বন্ধ। তাই বিগ্রহ দর্শনের সৌভাগ্য এবারে আর হ'লো না। বন্ধ মন্দিরের বাইরে থেকেই ঠাকুরকে নমষ্কার করে বেরিয়ে এলাম।

পূজাসামগ্রীর দোকান
রাজ্যের পুরাতাত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। মূল মন্দিরের সঙ্গে বিষ্ণুপুরের মন্দিরের মিল দেখা যায়। যদিও স্থাপত্যের নিদর্শন তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, তবে পর্যটকদের কাছে এই মন্দিরটি বেশ আকর্ষণীয়। পাঁচ চূড়া বিশিষ্ট এই পঞ্চরত্ন মন্দিরটি বাঁকানো কার্নিশযুক্ত। সামনের দিকে ও দু'পাশে তিনটি করে অর্ধবৃত্তাকার খিলান বিশিষ্ট প্রবেশপথ রয়েছে। মন্দিরের দেওয়াল জুড়ে পোড়ামাটির কাজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। খিলানের ওপরও রয়েছে অসংখ্য পোড়ামাটির কাজ। পোড়ামাটির অলঙ্করণগুলির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, রাধাকৃষ্ণের লীলা, রামায়ণের কাহিনী, দশাবতার, রাসমন্ডল চক্র, মিথুনদৃশ্য সহ বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী।

পোড়ামাটির অলঙ্করণ
মূল মন্দিরের পাশেই রয়েছে মহাকাল ভৈরবের থান, নাটমন্দির, ভোগঘর ও লেতনালা। মন্দিরের সামনে একটি নাটমন্দির আছে। নাটমন্দিরের কাছেই পশ্চিমদিকে রয়েছে 'মহাকাল ভৈরবের থান', সেখানে মাটির হাতি ঘোড়া দেবতা রূপে পূজিত হয়।

মহাকাল ভৈরবের থান

ঝাড়েশ্বর মন্দিরের ইতিহাস

আজ যেখানে এই মন্দির দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেখানেই মাটির নীচে ছিল এই শিবলিঙ্গটি। কোলকাতা আড়িয়াদহের পুরোহিত শীতলানন্দ মিত্র নামে জনৈক ব্যক্তি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এই গ্রামে গভীর জঙ্গলের মধ্যে একটি বটগাছের নীচে মাটি খুঁড়ে একটি শিবলিঙ্গ পেয়েছিলেন। তারপর ১৬২৯ খ্রীষ্টাব্দে (১০৩৬ বঙ্গাব্দে) ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে ওই বটগাছের নীচে প্রতিষ্ঠিত করা হয় শিবলিঙ্গটিকে। নাম দেওয়া হয় ঝড়েশ্বর শিব। পরে তৎকালীন মেদিনীপুর জেলার গড় আড়রার রাজা আলালনাথ দেব এখানে শিবের নিত্য পূজোর যাবতীয় ব্যবস্থা করে দেন। প্রতিটি মন্দিরের পিছনে যেমন বহুল প্রচলিত একটি কিংবদন্তি শুনতে পাওয়া যায় এই মন্দিরের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। শোনা যায়, আজ যেখানে এই মন্দির দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেই এলাকাটি আগে ঝোপ জঙ্গল ছিল। ওই জঙ্গলে রাখালরা নিয়মিত গরু চরাতে যেত, সেখানে ছিল একটি বটগাছ। সেই বটগাছের নীচে এক কৃষ্ণগাভী এসে সবার অলক্ষ্যে প্রতিদিন দুধ ঢেলে দিয়ে আসত। শীতলানন্দ স্বপ্নে দেখা এই জায়গাটি নিদর্শন করে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন।

গাভীমূর্তি
আগে একটি চালাঘরে শিবলিঙ্গটি প্রতিষ্টিত ছিল। কথিত আছে, নাড়াজোলের রাজা অযোধ্যা রাম খাঁনের দেওয়ান রামনারায়ণ জানা ঝাড়েশ্বর শিবের কাছে মানত করে কঠিন শূল রোগ থেকে সেরে ওঠেন। তার পরেই তিনি ১৮৩৪ খ্রীষ্টাব্দে (১২৪১বঙ্গাব্দে) ৯ই জ্যৈষ্ঠ বর্তমান পঞ্চচূড়া বিশিষ্ট এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন।

বর্তমান মন্দির
মন্দিরের উত্তরে অষ্টস্তম্ভ বিশিষ্ট 'লেতনালা' এবং পশ্চিমে 'ভোগঘর' আছে। কেশপুর থানার অন্তর্গত বেঁতলা গ্রামের জমিদার সনাতন চৌধুরী মহাশয়ের মনোস্কামনা সিদ্ধ হাওয়ায় ১৮৫১সালে (১২০৮ বঙ্গাব্দে) আটচালা রীতির শিবের 'ভোগঘর' এবং অষ্টস্তম্ভ বিশিষ্ট 'লেতনালা' নির্মাণ করেন।

ভোগঘর
ভোগঘরের একটা দেওয়ালে রয়েছে 'দ্বারবর্তিনী' মূর্তি। খড়খড়ি দেওয়া একটা আধখোলা দরজার পাশ থেকে উঁকি মারছে এক নারী। ওই খড়খড়ির আড়ালে দাঁড়ানো নারীমূর্তি সেকালের সমাজব্যবস্থারই পরিচয় দেয়। ওই সময়ের তৈরি অনেক মন্দিরেই এরকম দ্বারবর্তিনী মূর্তি দেখা যায়।

‘দ্বারবর্তিনী’ মূর্তি
ইচ্ছা পূরণ হয় বলে বিশ্বাস করে মেদিনীপুর জেলার নানা স্থান থেকে বহুলোক রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের জন্য এখানে নানারূপ মানত করেন এবং শিবঠাকুরের মাথায় জল ঢালতে আসেন। আজও এখানে নিত্য পুজোর পাশাপাশি প্রতি বছরে শ্রাবণী উৎসব, দুর্গাপুজো, শিবরাত্রির ব্রত ও চৈত্র সংক্রান্তির গাজন মেলা ধুমধাম সহকারে হয়ে থাকে। দেখতে দেখতে কেটে যায় কয়েকটা ঘন্টা। এবার ঝাড়েশ্বর মহাদেবকে দু-হাত জুড়ে প্রণাম করে আমরা বাড়ির রাস্তা ধরলাম।

মন্দিরের সামনে গ্রাম্য পরিবেশ
» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল (তথ্যসূত্রঃ- পশ্চিমবঙ্গের পূজা-পার্বণ ও মেলা - তৃতীয় খন্ড)
JHARESWAR TEMPLE, ANANDAPUR, PASCHIM MEDINIPUR, WEST BENGAL
Continue Reading
Arabinda Pal
2 Comments

You Might Also Like

[name=Arabinda Pal] [img=https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEia50rmuKEAcbGUbQKvAbzUmdviiIhm-LeVlsEEdFx_xtGfyvx8O02yFVuJemgswzSA8PoMcN-XW0AcinKr9iq28lHK43Z4TFFyL7pJyGGxLNx9LGn0cLvPz0lUJzNrWBo9n_NyxGLjDII/h120/IMG_2788.jpg] [description=পর্যটক হিসাবে নয়, একজন ভ্রমণকারী হিসাবে বেড়ানোটা আমার কাছে একটা নেশা এবং ফটোগ্রাফিতেও আমার ভীষণ শখ। তাই একজন ভ্রমণকারী হিসাবে আমার এই ব্লগে নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা ও ছবিগুলো যদি আপনাদের ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই আপনাদের মতামত কমেন্টসের মাধ্যমে জানাতে ভুলবেন না।] (facebook=https://www.facebook.com/groups/2071066419824586/user/100002484831922) (twitter=Twitter Profile Url) (instagram=https://www.instagram.com/arabindapal2020/) (bloglovin=Blogvin Profile Url) (pinterest=https://www.pinterest.com/arabindapalbrb/) (tumblr=Tumblr Profile Url)

Follow @Arabinda Pal