Theme Layout

Boxed or Wide or Framed

Theme Translation

Display Featured Slider

Yes

Featured Slider Styles

[Centred][caption]

Display Grid Slider

No

Grid Slider Styles

[style5][caption]

Display Trending Posts

Display Author Bio

Yes

Display Instagram Footer

Yes

Dark or Light Style

Showing posts with label Jhargram. Show all posts
Showing posts with label Jhargram. Show all posts
 'চারমূর্তি' খ্যাত টেনিদার কাঁকড়াঝোর

'চারমূর্তি' খ্যাত টেনিদার কাঁকড়াঝোর


এভাবে আর কতদিন? ঘরে থাকতে থাকতে বোর হয়ে যাচ্ছি। জানিনা করোনা থেকে কবে মুক্তি পাবো! তবে পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই একঘেয়ে জীবন থেকে নিজেকে সতেজ রাখতে ছোট খাটো ট্যুর-এ বেরিয়ে পড়ি। প্রতিবারের মতো এবারও ছুটির দিনগুলো কাটাতে চললাম 'চারমূর্তি' খ্যাত টেনিদার কাঁকড়াঝোরে। কাঁকড়াঝোর মানে শুধুই জঙ্গলের হাতছানি। কাঁকড়াঝোর মানে শাল মহুয়ার বুনো গন্ধ গায়ে মেখে পাহাড় আর গাছেদের সংসারে রোমাঞ্চকর পথে ঘুরে বেড়ানো। কাঁকড়াঝোর মানে কিছু সহজ সরল আদিবাসী মানুষজনের অনাড়ম্বর জীবনযাপন চাক্ষুষ করা। সব মিলিয়ে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়ার সব রসদই মজুত রয়েছে কাঁকড়াঝোরে। আঞ্চলিক ভাষায় 'কাঁকড়া' শব্দের অর্থ পাহাড় আর 'ঝোর' শব্দের অর্থ জঙ্গল। সত্যি কি তাই? হ্যাঁ একদমই সত্যি! পাহাড় ঘেরা বিস্তীর্ন জঙ্গলের মাঝে নিরিবিলি আর শান্তিতে বেড়ানোর একটা আদর্শ জায়গা।

কাঁকড়াঝোর মানে শুধুই জঙ্গলের হাতছানি
করোনা আতঙ্ক ভুলে একঘেয়ে জীবনে একটু অক্সিজেন জোগাতে উৎপলকে সঙ্গে করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শাল, পিয়ালের বনের দিকে। মেদিনীপুর শহর ছাড়িয়ে ভাদুতলার মোড় থেকে টার্ন নিয়ে লালগড় হয়ে দহিজুড়ি, সেখান থেকে সোজা শিলদা মোড় পেরিয়ে চলে এলাম বেলপাহাড়ি ইন্দিরা চকে।

আমাদের ডেস্টিনেশন 'কাঁকড়াঝোর'; তবে তার আগে ঘুরে নেবো 'লালজল'। 'লালজল'..... নামটা শুনেই কেমন যেন একটা নেশার ঘোর চলে এলো। একদম ঠিক, এই লালজলের নেশায় গাড়ি ছুটে চললো বাঁশপাহাড়ির দিকে। প্রকৃতির নেশায় ঘোর লেগেছে। এইতো কিছুদিন আগে এই 'বারোমাইল' জঙ্গলের রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে দলমা থেকে ঘুরে এলাম। তবুও মন ভরেনি, তাই আবার ছুটলাম। ভুলাভেদা, যাতিহারা পেরিয়ে চলে এলাম জামতলগোড়া। সিআরপিএফ ক্যাম্পের পর আরও একটু এগিয়ে যেতেই পড়ল লালজল মোড়। এখান থেকে প্রায় দু-কিলোমিটার ভিতরে লালজল গ্রাম। মেন রোড ছেড়ে ডান দিকের ভাঙাচোরা লাল মেঠো রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। বহু কসরত করে গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে গেলাম লালজল গ্রামে।

পৌঁছে গেলাম লালজল গ্রামে
ঝাড়গ্রামের পর্যটন মানচিত্রে এক উল্লেখযোগ্য নাম 'লালজল'। দেওপাহাড়, রানীপাহাড় আর সিংলহর পাহাড় দিয়ে ঘেরা ছোট্ট এক গ্রাম লালজল। বাড়িঘরের বালাই নেই। গুটিকয়েক গ্রাম্য বাড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কিন্তু কি আছে এই লালজল গ্রামে?

শুনেছি এই লালজল গ্রামের দেওপাহাড়ে রয়েছে আদিম মানুষের গুহা। রাস্তার একপাশে বোর্ডে লেখা 'লালজল দেবী পাহাড়'। জঙ্গলঘেরা এক পাথরের পাহাড়। আমাদের আকর্ষণ এই লালজল দেবী পাহাড়কে ঘিরে। লালজল দেবী পাহাড়ের প্রকৃত নাম 'দেওপাহাড়'। পাহাড়ের কোলে একটা আশ্রম আছে। সাধু-সন্ন্যাসীদের বসবাস ওখানে। গুহার ঠিক একধাপ নিচে একটা দুর্গা মন্দির।

পাহাড়ে চড়ার রাস্তা, পাশেই দুর্গা মন্দির
আশ্রমের ঠিক পাশেই গাড়ি পার্ক করে মন্দিরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। এপর্যন্ত উঠতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি। এরপর একটা ছোট ট্রেক। পাহাড়ের খাঁজ ধরে সতর্ক ভাবে উঠতে হবে। মন্দিরের পাশ দিয়ে এবার পাহাড়ে উঠতে শুরু করলাম, লালজলের নেশায় উঠে চলেছি। বড় বড় পাথরের খাঁজ ধরে আস্তে আস্তে পাহাড়ের উপরের দিকে উঠছি। ভয়, আগ্রহ, বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশ একটা রোমাঞ্চ বোধ করছিলাম। পাথরের খাঁজে খাঁজে পা রেখে আমরা এক গুহার সামনে এসে হাজির হলাম। এটাই আদিম মানুষের গুহা। গুহার মুখ এতটাই সঙ্কীর্ণ যে হামাগুড়ি দিয়ে গুহার মধ্যে ঢুকে দেখা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়।

পাথরের খাঁজে পা রেখে এগিয়ে যাওয়া
লালজল গুহার সম্বন্ধে কোথাও বিশেষ কিছু তথ্য পায়নি। পাহাড়ে ওঠার মুখে সাইনবোর্ডটাতে লেখা রয়েছে লালজল দেবী পাহাড়ের প্রতিষ্ঠাতা রামস্বরূপ দেবশর্মা। পাহাড়ের আবার প্রতিষ্ঠাতা! লেখাটা পড়ে কেমন যেন একটা লাগলো। কিন্তু কে ছিলেন এই রামস্বরূপ দেবশর্মা? বহুদিন আগে আনন্দবাজারে প্রকাশিত একটা লেখা পড়ে যেটুকু জানতে পেরেছি তা হলাে... ষাটের দশকে রামস্বরূপ দেবশর্মা নামে এক সন্ন্যাসী লালজলে এসে এই গুহায় আশ্রয় নেন। গুহায় একটি চিতাবাঘও ছিল। জনশ্রুতি, ওই চিতাবাঘের সঙ্গেই নাকি গুহায় থাকতেন সন্ন্যাসী রামস্বরূপ। রামস্বরূপের উদ্যোগে লালজলে বাসন্তী পুজোর প্রচলন হয়। এখনও সেই বাসন্তী পুজোর চল রয়েছে। রামস্বরূপ মারা গেলে দেওপাহাড়ের কোলেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

দূরে ঐ পাহাড় মিশেছে নীল আকাশে
গুহার সামনে একটা চাতালের ওপরে দাঁড়িয়ে ছবিটবি তোলার পর উৎপল বললো চলো এবার উঠতে হবে পাহাড়ের চূড়োয়। পাহাড়ের চূড়োয় ওঠা বেশ কষ্টসাধ্য। ভাবলাম আমি এখান থেকেই ফিরে যাব। একটু পরেই হৈহৈ করে স্থানীয় কিছু কিশোর-তরুণ এসে হাজির, তারা এই লালজলের নেশাটাকে আরও বাড়িয়ে দিল।

স্থানীয় কিশোর-তরুণের দলের সাথে
ওই কিশোর-তরুণদের অনুপ্রেরণায় পাহাড়ের চূড়োয় উঠতে শুরু করলাম। আবার চড়াই শুরু। চড়াই ভাঙতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। হাঁফ ধরে যাচ্ছিল দ্রুত। শেষে পাহাড়ের চূড়োয় পৌঁছাতে সক্ষম হলাম। একেবারে পাহাড়ের চূড়োয় যে ছোট্ট চাতালটার ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি দেখি সেটাই পাহাড়ের চূড়োর শেষ পাথর।

পাহাড়ের চূড়োয় শেষ পাথরে দাঁড়িয়ে আছি
চলে এসেছি নাগরিক সভ্যতা থেকে দূরে প্রকৃতির কোলে। আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে! দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ উপত্যকা, দূরে কখনও দৃশ্যমান ছায়া-আবছায়ায় রানীপাহাড় আর সিংলহর পাহাড়ের সারি। এই রূপ শুধু চোখ ভরে দেখার। প্রকৃতির সাথে মিশে গেলাম।

জঙ্গলঘেরা এক পাথরের পাহাড়
কিছুক্ষন এই দৃশ্য উপভোগ করার পর ফটোশেসন করে নিচে নামতে শুরু করলাম। একটু অসাবধান হলেই পা হড়কে যেতে পারে। সাবধানে পাথরের খাঁজে খাঁজে পা রেখে নিচে নেমে এলাম। গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে যে পথে এসেছিলাম, চললাম সেই পথেই। আবার মেন রোডে ফিরে এলাম।

লালজল ছেড়ে চললাম সেই পথেই
লালজল ত্যাগ করে আবার বাঁশপাহাড়ির পথে এগিয়ে যাচ্ছি নির্জনতার সন্ধানে। বিখ্যাত শিয়াড়বিন্ধা চড়াই পেরিয়ে চাকাডোবা মোড়ে পৌঁছে গেলাম। এখান থেকে ছুরিমারা হয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে কাঁকড়াঝোরের দিকে। চাকাডোবা থেকে কাঁকড়াঝোরে যাওয়ার এই পথটা বেশ রোমাঞ্চকর। এই পথে নির্জনতাই বড় প্রাপ্তি, মানুষজনের দেখা খুব একটা মেলে না। ঘন সবুজ জঙ্গলের মধ্যে নির্জন রাস্তায় পাখির ডাক ছাড়া প্রায় কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।

ময়ূরঝর্ণা এলিফ্যান্ট রিজার্ভ ফরেস্ট
পাহাড় আর জঙ্গলের অকৃত্রিম সৌন্দর্য আর নির্জনতাকে সঙ্গী করে চলেছি। মনে হচ্ছিল এ পথে গাড়ি চলা যেন শেষ না-হয়। দৃশ্যপট ক্রমশ পাল্টাচ্ছে, ঢেউখেলানো পাহাড় দেখা যাচ্ছে, বাড়ছে সবুজের ঘনত্ব। কখনও ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত, আবার কখনও প্রকৃতি উপভোগ করে এগিয়ে যাচ্ছি। নিজে চালক হওয়ায় যেখানে খুশি দাঁড়ানো যায়, ছবি তোলা যায় ইচ্ছেমতন। বকডুবা জঙ্গলের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে ময়ূরঝর্ণা গ্রাম পার হয়ে চলে এলাম সিআরপিএফ ক্যাম্প যাওয়ার রাস্তায় শালবনের মাঝে 'কাঁকড়াঝোর গেস্ট হাউসে'।

চলে এলাম কাঁকড়াঝোরে
কাঁকড়াঝোরের এই নতুন গেস্ট হাউসের জায়গায় ছিল গোলবারান্দা সহ সুন্দর ছিমছাম এক বনবাংলো 'বনানী'। গাছমছমে জঙ্গলের মাঝে বন দফতরের ওই বাংলোতেই শ্যুটিং হয়েছিল নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদার কাহিনি অবলম্বনে 'চারমূর্তি' সিনেমার। প্যালারাম, ক্যাবলা আর হাবুলকে নিয়ে সেই বনবাংলোয় উঠেছিল টেনিদা। আজ আর তার অস্তিত্ব নেই। 'চারমূর্তি' ছবিতে টেনিদা আর তার তিন সঙ্গী হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যে যে ঝন্টিপাহাড়ে গিয়েছিলো সেটা বাস্তবের এই কাঁকড়াঝোর। এই সিনেমার বেশিরভাগ আউটডোর শুটিং হয় এখানের পাহাড়-জঙ্গলে।

'কাঁকড়াঝোর গেস্ট হাউস'
গেস্ট হাউসের কাছে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার থেকে একটু দূরে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। মারো পাহাড়, খচলা পাহাড়, লাকাইসিনি পাহাড় নাম সব। ঘন শাল-মহুয়ার জঙ্গল, ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-একটা শিমুল বা অন্য কোনও গাছ। নির্জন প্রকৃতির রাজ্যে নেই কোন কোলাহল, কোন কৃত্রিমতা। কেবল প্রকৃতির অপার সজীবতা অনুভব করা আর বুক ভরে তাজা অক্সিজেন নেওয়া। দুপুর সাড়ে বারোটা, দোকানপাট কিছুই নেই। লাঞ্চের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। গেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার কাম রাঁধুনি সৌমিত্রদাকে ম্যানেজ করে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করে ফেললাম। সৌমিত্রদার কাছে জানতে পারলাম, সামনে একটা দারুণ স্পট আছে, নাম দুরাসিনি ড্যাম। আর তার পাশেই একটা ‘জাগ্রত’ কাল ভৈরব মন্দির। খাবার রেডি হতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে। অতএব গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি ভৈরব মন্দিরের খোঁজে।

'চারমূর্তি' সিনেমার শুটিং লোকেশন
'চারমূর্তি' সিনেমার কৃষ্ণকায় ঝন্টুরামকে মনে আছে কি? যাকে প্রথম দর্শনেই ভূত ভেবে ভয় পেয়ে ভিরমি খেয়েছিল টেনিদা। সেই ঝন্টুরামের চরিত্রে অভিনয়কারী গোপীনাথ মাহাতোর বাড়িতেই গড়ে উঠেছে হোমস্টে। 'চারমূর্তি' সিনেমার ছোট্ট একটি দৃশ্যে পাকানো গোঁফওলা গাড়োয়ানের চরিত্রে দেখা গিয়েছিলো এই গ্রামেরই বাসিন্দা গোপীনাথ মাহাতোকে। গেস্ট হাউস থেকে ওদলচুয়ার দিকে খানিকটা যেতেই রাস্তার ধারে পড়লো গোপীনাথ মাহাতোর মাটির দোতলা বাড়ি। গোপীনাথবাবু প্রয়াত হয়েছেন, ভাইপো মধুসূদন মাহাতো এখন হোমস্টের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন।

গোপীনাথ মাহাতোর বাড়ি
গোপীনাথবাবুর বাড়ির সামনের সোজা ঢালাই রাস্তাটা চলে গেছে লাকাইসিনি পাহাড়ের দিকে। খানিকটা এগিয়ে মেন রোড ছেড়ে ডান হাতে একটা সরু রাস্তায় ঢুকে পড়ি। গেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার সৌমিত্রদার কাছে জানতে পেরেছিলাম যে এই পথেই ভৈরব থান। কিছুটা এগিয়ে দেখি এক জায়গায় বেশ কিছু হোমস্টে, জায়গাটা একটু ঘিঞ্জি মতো। এখানেই 'চারমূর্তি' হোমস্টে। 'চারমূর্তি' হোমস্টের নাম অনেকের কাছে শুনেছি। গ্রামীণ বাড়ির আদলে তৈরি হোমস্টের তিনটি রুম যথাক্রমে প্যালা, হাবুল ও ক্যাবলা - টেনিদার এই তিন শাগরেদের নাম অনুযায়ী রাখা হয়েছে। প্রতিটি রুমের ভিতরে রয়েছে টেনিদার কাহিনীর নানা ছবি। কোলকাতার একটি পর্যটন সংস্থার প্রধান সিন্টু ভট্টাচার্য স্থানীয় গ্রামবাসীর জমি লিজ নিয়ে এই হোমস্টে গড়ে তুলেছেন। দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন ওই জমির মালিক মধুসূদন মাহাতো ও ঠাকুরদাস মাহাতো।

'চারমূর্তি' হোমস্টে
চারমূর্তি হোমস্টে পার হয়ে চলে এলাম। খানিকটা যেতেই শুরু হলো পুরো লাল মাটির উঁচু নিচু এবড়ো খেবড়ো রাস্তা। খুব সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। গাড়ির চাকার দাগ দেখে ভাবলম এই রাস্তায় গাড়ি যায়। সামনে সাহস করে এগোলাম। কিছুটা যাবার পরই রাস্তাটা ঘুরে ছোট একটা মাঠ মতো জায়গায় এসে পড়ল। একটা ভৈরবের থান। জঙ্গলের মধ্যে জীর্ণ পরিত্যক্ত এক ভাঙ্গা ঘর দেখে মনে হলো ওটা হয়তো পুরানো মন্দির। পাশে ছোট্ট একটা ঘর, এটাই এখন মন্দির। মন্দিরের সামনের বোর্ড দেখে বুঝলাম আমরা এখন ঝাড়খণ্ডে আছি।

চলেছি নির্জন থেকে নির্জনের দিকে
সামনের মাঠে গাড়ি রেখে আমরা নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম। দূরে পাহাড় আর নীচে ছোটো বড় পাথরের ওপর জলের ধাক্কা খেতে খেতে ঢিমে তালে বয়ে চলেছে 'ভৈরবী' নামের এক ছোট্ট নদী। নদীর জল বাঁধ দিয়ে আটকানো, এর নাম দুরাসিনি ড্যাম।

ছবির মতো সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ
সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ, যেন ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতো। নদীর জলে খয়ে যাওয়া পাথরের অবিন্যস্ত লুকোচুরি, জলের সাথে। পিকনিকের আদর্শ জায়গা। জলের মধ্যে পড়ে থাকা পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে চললো কিছুক্ষণ ফটোসেশন।

প্রকৃতির যেন এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখছি
আমাদের দেখে কিছু কচিকাঁচার দল জুটল। চোখে মুখে খুব সরলতা আর দারিদ্রের ছাপ। অপুষ্টিতে ভুগছে তা দেখে সহজেই বোঝা গেলো। সঙ্গে খাবার ছিলো না, অগত্যা খুচরো কিছু টাকা দিয়ে যতটা সম্ভব হয় সাহায্য করলাম। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর গেস্ট হাউসে ফিরলাম। ফিরে এসে দেখি আমাদের খাবার রেডি হয়ে গেছে। খানিকপরেই টেবিলে গরম গরম খাবার চলে এলো। দেশী মুরগীর মাংস তো আছেই, তার সাথে ভাত, ডাল, ঝুরি আলু ভাজা, তরিতরকারি, শেষপাতে আবার চাটনি। আহা! এই জঙ্গলে আর কি চাই। খাওয়াদাওয়া সেরে গাড়ি নিয়ে আবার রওনা দিলাম।

খেলায় মাতোয়ারা কচিকাঁচারা
কাঁকড়াঝোরকে পিছনে ফেলে ওদোলচুয়ার (স্থানীয় লোকেরা বলে উদুলচুয়া) দিকে চলেছি কেটকি ঝর্ণা খুঁজতে। দূরে ঢেউখেলানো ছোট ছোট পাহাড়, নিচে সবুজ উপত্যকা। দুইদিকের পাহাড়ের চাপে কখনো সরু হয়ে গেছে উপত্যকা। জায়গায় জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো চাষের জমি। কোথাও ধান কাটা হয়ে গিয়েছে, আবার কোথাও অল্পস্বল্প চাষ হয়েছে। শাল-মহুয়ার জঙ্গলের মাঝে নাম না জানা ছোট ছোট গ্রাম। বেশিরভাগই সাঁওতাল গ্রাম। মাটির বাড়ি আর বাড়ির দেওয়ালে সুন্দর নকশা আঁকা। রোজকার মতোই গ্রামের মেয়েরা বাবুই ঘাসের দড়ি পাকিয়ে চলেছে এক মনে। দেখতে দেখতে সুন্দর আঁকা বাঁকা রাস্তায় এগিয়ে চলেছি আমরা। এখানে গুগল ম্যাপ ঠিক মতো কাজ করছে না। অল্প সময়ের মধ্যেই মাকুরভুলা, কদমডিহা, বুড়িঝোর, সিঙ্গাডুবা, চিরাকুটি গ্রাম পেরিয়ে আমরা অনেকটা পথ এগিয়ে চলে যাই। কেটকি ঝর্ণায় কোন দিকে যাবো, পথ খুঁজে পাচ্ছি না। কোনও দিকনির্দেশও দেখতে পেলাম না। স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারলাম কেটকি ঝর্ণা সিঙ্গাডুবা গ্রামে। গাড়ি ঘুরিয়ে ফের চললাম সিঙ্গাডুবার দিকে। হঠাৎ দেখলাম রাস্তার ধারে একটা সাইন বোর্ড, তাতে লেখা "সিঙ্গাডুবা"। ডান দিকে চোখ মেলে দেখি একটা বড় বটগাছ।

নজরকাড়া মাটির দেওয়াল
মেন রোড ছেড়ে বটগাছের উল্টোদিকের রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। গ্রামের ভিতর দিয়ে গোরু, ছাগল, মুরগী তাড়াতে তাড়াতে এগিয়ে যাচ্ছি। এক জায়গায় এসে দেখি রাস্তাটা দু'ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। বোঝা যাচ্ছে না কোন দিকে যাবো, জিজ্ঞেস করার মতোও কেউ নেই। হঠাৎ দেখি এক খুদে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে ইশারা করছে, বুঝে গেলাম ঐ দিকেই যেতে হবে।

'কেটকি ঝর্ণা'! পথের শেষে তার ঠিকানা
গ্রাম ছাড়িয়ে লাল এবড়ো খেবড়ো মেঠো রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে হাজির হলাম এক নির্জন জনমানব শূন্য লেকের ধারে। নামে ঝর্ণা হলেও আসলে এটা একটা জলাশয়। স্থানীয় লোকের ভাষায় ঝর্ণা মানে লেক বা বড় পুকুর।

হাজির হলাম কেটকি লেকের ধারে
চেরাং পাহাড়ের কোলে কেটকির জলাশয়টা অনেকখানি জায়গা জুড়ে। চারপাশে এক অপরিসীম নিস্তব্ধতা, কেবল জঙ্গলের ভিতর থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে অজানা পাখির কুজন। শীতের মিঠে রোদ গায়ে মেখে লেকের আশেপাশে ঘুরে কিছু ছবি তুললাম। নীরব, নির্জন, কোলাহলমুক্ত এইরকম একটা মায়াময় পরিবেশে কার না দু-দণ্ড বসতে ইচ্ছে করে। উৎপল লেকের ধারে সবুজ ঘাসে গা এলিয়ে দিয়ে বসে পড়লো।

নিস্তব্ধতার আর এক নাম 'কেটকি লেক'
নাহ, এখানে আর আর বেশিক্ষন থাকা যাবেনা। দিনের আলো কমে আসছে। অনেকখানি রাস্তা যেতে হবে, দেরি করা ঠিক হবেনা। এবার আমাদেরও ফিরতে হবে। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে রওনা দিলাম। কেটকি থেকে বেরিয়ে আবার মেন রোডে ফিরে এসে এগিয়ে চললাম চাতন ডুংরির দিকে। মনের পাতা আর ক্যামেরায় বন্দি হয়ে রইল কেটকি ঝর্ণার নয়নাভিরাম সেই সব দৃশ্য।

এক মায়াময় পরিবেশ
আমাদের এই ট্রিপে শেষ গন্তব্য, চাতন ডুংরি সানসেট পয়েন্ট। সেখানে একটা আদিম মানুষের গুহা আছে বলে শুনেছি। কিন্তু চাতন ডুংরি কোথায় তা আমাদের সঠিক জানা নেই। রাস্তায় কোনও সাইন বোর্ডও চোখে পড়ছে না। চারদিকে একটা লোকও নেই জিজ্ঞেস করার জন্য। ফলে গুগল ম্যাপের উপরে ভরসা করেই এগোতে থাকলাম। গুগল ম্যাপও ঠিক মত কাজ করছে না। রাস্তা প্রায় শুনশান। এরকম অবস্থায় হঠাৎ করেই দেখা পেলাম এক গ্রামবাসীর। তার কাছে লোকেশনটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। বিশেষ কিছু লাভ হল না। একটু এগোতেই আর এক গ্রামবাসীর সাথে দেখা। ওনার কথায় আমরা চাতন ডুংরি পেরিয়ে চলে এসেছি। অচেনা জায়গা হলে যা হয়। গাড়ি ঘুরিয়ে আবার চললাম সেদিকে। কোদাপুরার কাছে রাস্তার ধারে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানের সামনে গাড়ি থামালাম। গুগল ম্যাপ বলছে, সানসেট ভিউ পয়েন্ট এখানে পাহাড়ের উপরে। কিন্তু রাস্তা কোথায়? এদিক সেদিক খোঁজাখুঁজি করে দেখা গেলো জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা সরুপথ পাহাড়ের উপরে উঠে গেছে। ওই পথে পায়ে হাঁটা ছাড়া কোনো গাড়ির যাওয়া সম্ভব নয়। মুশকিলটা হল ওটাই রাস্তা কিনা সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এখন কোনদিকে যাব কি করব! কিছুই তো বুঝে উঠতে পারছি না।

চলেছি চাতন ডুংরি-র পথে
গুগল ম্যাপ ওপেন করে আবার সামনে এগােতে থাকলাম। মেন রোড ধরে কিছুটা এগিয়ে ঢুকে পড়লাম একটা সরু লাল মাটির রাস্তায়। দু'ধারে ঝোপঝাড়, ডালপালাগুলো যেন রাস্তাটাকে আগলে রেখেছে। ঘন ঝোপ গাড়ির গায়ে ছোঁয়া দিয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করে ঐ রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে ঢুকে পড়লাম এক আদিবাসী গ্রামে। এই গ্রামে এসেই রাস্তা শেষ, এখান থেকে একটা রাস্তা আছে বটে কিন্তু সে রাস্তায় গাড়ি যাবেনা। রাস্তার এক পাশে গাড়ি দাঁড় করে ভাবছি কী করব! জনা কয়েক গ্রামবাসী আমাদের দেখে কৌতূহলী চোখে এগিয়ে এলো, তাদের সাথে আলাপও হল। ওদের কাছ থেকে জানলাম পাহাড়ের উপরে সানসেট পয়েন্ট। পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই। গ্রাম ছাড়িয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে দেখি একটা রাস্তা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে। আমি উৎপলকে বললাম আর এগিয়ে কাজ নেই। এখান থেকেই ফিরে চলো। গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম এক ফাঁকা মাঠের মধ্যে। দিন ক্রমে ফুরিয়ে এল; দেখি সূর্য প্রায় অস্ত গেছে, লাল আকাশটা আস্তে আস্তে কালচে নীল হয়ে যাচ্ছে। একটু একটু করে এক সময়ে সূর্য পাহাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল। আমরাও ফিরে আসার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে আবার মেন রোডে চলে এলাম। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে এলাম বেলপাহাড়ির ইন্দিরা চকে। মেন রোডর উপর চায়ের দোকানে গলা ভিজিয়ে আর অপেক্ষা না করে সোজা বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

ঢুকে পড়লাম এক আদিবাসী গ্রামে
» থাকার ব্যবস্থা

কাঁকড়াঝোরে বেড়াতে গিয়েছেন... ভাবছেন থাকবেন কোথায়! এখন কাঁকড়াঝোরে থাকার জন্য একটি সরকারি গেস্ট হাউসের পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি হোমস্টে রয়েছে। এখানে হোমস্টেগুলো জঙ্গলমহলের নিজস্ব সংস্কৃতি দিয়ে সাজানো সাদামাটা বাড়ি। মনে রাখবেন হোটেলের মতো সব আধুনিক সুযোগ সুবিধা এখানে পাওয়া যাবেনা।

» কাঁকড়াঝোরে থাকার হোমস্টে
  • কাঁকড়াঝোর গেস্ট হাউসঃ- +৯১ ৯৪৭৬১২৫৪২৯, +৯১ ৯৭৩৪৮০২০৭৯, +৯১ ৭৩১৮৮১৫৫৯৭
  • মাহাতো হোমস্টেঃ- (মাটির দো-তলা বাড়ি) +৯১ ৮৭০৯৮৩৪৩৮৫
  • চারমূর্তি হোমস্টেঃ- +৯১ ৯৮৩৬৮৩০৩৪২, +৯১ ৬২৯১৩৭৭১৫৪, +৯১ ৯৮৩১৩০৯৫১২
  • কাঁকড়াঝোর হোমস্টেঃ- +৯১ ৯৪৭৪৯৪৬০৯৯, +৯১ ৮১০১৪৫০০৭২
  • কাঁকড়াঝোর ইকো ক্যাম্পঃ- +৯১ ৭৪৩৯৯০৮০৩৮, +৯১ ৯৮৩০৯৪৪৯৯০, +৯১ ৯০৭৩৯১১০৩৭
  • শালবাড়ি হোমস্টেঃ- +৯১ ৭০০৩৪৫৭৫১৫
  • ধিতাং হোমস্টেঃ- +৯১ ৯৮৩৬৬৯০৭৫৪
» কাঁকড়াঝোরের বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান
  • ভৈরব থান ও দুরাসিনি ড্যাম
  • কেটকি লেক
  • ময়ূরঝর্ণা
  • আমঝর্ণা
  • আমলাশোল গ্রাম
» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল
Continue Reading
Arabinda Pal
4 Comments

You Might Also Like

প্রকৃতির টানে বেলপাহাড়ির জঙ্গলে

প্রকৃতির টানে বেলপাহাড়ির জঙ্গলে


প্রকৃতির টানে বেলপাহাড়ির জঙ্গলে

জঙ্গলমহলের অন্যতম প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্র বেলপাহাড়ি। উইকএন্ড ট্যুরের জন্য আদর্শ জায়গা এটা। এখানে প্রকৃতি তার নিজস্ব সৌন্দর্য মেলে ধরেছে। এখানকার শাল, পিয়াল, মহুয়া, ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি গাছে ভরা গভীর জঙ্গল এবং আদিবাসী গ্রাম, ছোটো পাহাড়, নদী, ঝর্ণা আর পাথুরে লাল মাটির রাস্তা সব মিলিয়ে অরণ্যের এক মনোমুগ্ধকর ভয়ঙ্কর সুন্দর এই সৌন্দর্য একবার ঘুরে আসার পরে যেন বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। অফিসে কাজের ফাঁকে আমি আর সৌমেন দুজনে গল্প করছিলাম। হঠাৎ স্বরূপ এসে হাজির, আমাদের আলোচনা শুনে বেলপাহাড়ি ভ্রমণের প্রসঙ্গ উঠলো। তিনজনে এককথাই রাজি হয়ে গেলাম, অনেক আলোচনার পর ঠিক হল সামনে শনিবার বেলপাহাড়ি যাওয়া হবে। এবারে আমাদের গন্তব্যস্থান ছিল খাঁন্দারানি লেক, গাড়রাসিনি পাহাড়, তারাফেনি ব্যারেজ ও ঘাগরা জলপ্রপাত। করোনা আবহে বাইরের খাবার খাওয়া চলবে না, তাই সকলে খাবারের মেন্যু ভাগ করে নিলাম। আমাদের ফটোগ্রাফি গ্রুপের আর এক সদস্য অরিন্দম এই সফরে আগ্রহী থাকলেও বিশেষ কারণে যোগদান করতে পারেনি।

ঝিটকার জঙ্গলে আমরা তিনজন
আমাদের ট্যুরের প্রি প্ল্যান অনুযায়ী সকাল সাড়ে সাতটায় গাড়ি নিয়ে সৌমেনের ঘরে চলে এলাম। সৌমেনকে গাড়িতে তুলে নিয়ে এরপর গেলাম স্বরূপের বাড়িতে। দেখি ছোট্ট একটা ব্যাগ হাতে এগিয়ে আসছে। কাছে এসে বলল 'আমি কিন্তু কথা রাখতে পারলাম না'। মানে, মাংসটা আনতে পারিনি। সৌমেন একটু অসন্তুষ্ট হয়ে পড়লো। তাহলে দুপুরের খাওয়া আজ হবে না! এবার কি হবে? আমি দুজনকে তখন আশ্বস্ত করে বললাম কোনো চিন্তা নেই, তোমরা না বললেও আমি কিন্তু সমস্ত খাবারের ব্যবস্থা করে এনেছি।

লালগড়ের আগে ঝিটকার জঙ্গলে এক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে কয়েকটা ছবি তুললাম। লালগড় পর্যন্ত রাস্তাটা ভালো করে জানা ছিল। লালগড়ে কংসাবতী নদীর উপরে নতুন ব্রিজ হয়েছে। ব্রিজের ওপারে কোনোদিন যায়নি। ব্রিজ পেরিয়ে জিপিএস-এর দেখানো ডানদিকের মোরাম রাস্তাটা দেখে যাওয়ার সাহস হলো না। পরে ফেরার সময় ঐ রাস্তা দিয়ে আসার সময় বুঝলাম যাওয়ার সময় না গিয়ে ভালোই করেছিলাম। খানাখন্দে ভরা ভয়ঙ্কর সেই সাড়ে চার কিলোমিটার রাস্তার কথা বহুদিন মনে থাকবে। লাইফে প্রথমবার কোনো ভয়ঙ্কর রাস্তায় গাড়ি ড্রাইভ করেছিলাম। রাস্তার পাশেই মোড়ের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্থানীয় এক বাসিন্দা। তাঁকে জিজ্ঞেস করতে উনি আমাদের দহিজুড়ি হয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন। আমরা সেই পথ অনুসরণ করে মসৃন রাস্তায় দহিজুড়ি পৌছালাম।

লালগড় ব্রীজ
দহিজুড়ি ছেড়ে এবার এগিয়ে চললাম বেলপাহাড়ির দিকে। পথে পড়ল বিনপুর, শিলদা। গাড়ি ছুটে চলেছে। এই রাস্তায় জঙ্গল প্রায় নেই, দু' ধারে ধানখেত। চলে এলাম বেলপাহাড়ির ইন্দিরা চকে। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল খাঁন্দারানি লেক। ইন্দিরা চক থেকে একটু এগিয়ে হদরামোড়। একটা নীল সাইন বোর্ড। বাঁয়ে গাড়রাসিনি পাহাড়। আগুইবিল গ্রামের পাশের এক অখ্যাত পাহাড়। আমরা সেই পথ ধরে এগিয়ে চলেছি। গোহালবেড়্যা গ্রামে এসে রাস্তাটার দুটো ভাগ হয়ে গেছে। ডানে খাঁন্দারানি লেক। বাঁয়ে গাড়রাসিনি পাহাড়।

আগুইবিল গ্রামে পবিত্রা হোমস্টের কাছে
গোহালবেড়্যা গ্রাম থেকে বাম দিকের রাস্তা ধরে কিছুটা যেতেই পথ হারিয়ে ফেললাম। জিপিএস কাজ করছে না। গ্রামের লোককে জিজ্ঞেস করে এদিক ওদিক ঘুরে চলে এলাম আগুইবিলে পবিত্রা হোমস্টের কাছে। রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে এলাম। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট গ্রাম আগুইবিল। প্রকৃতি এখানে উদার। দূরে দেখা যাচ্ছে গাড়রাসিনি পাহাড়। তখন আমাদের পাহাড়ে ওঠার মানসিকতা আর ছিল না। দু'একটা ছবি তুলে আবার গাড়ি ঘুরিয়ে নিলাম।

দূরে গাড়রাসিনি পাহাড়
আগুইবিল থেকে আমরা আবার সেই আগের পথ ধরে চলেছি। গোহালবেড়্যা এসে পাকা রাস্তা ছেড়ে ডান দিকে খাঁন্দারানি লেকের পথ ধরলাম। পুরোটাই লাল মাটির রাস্তা, গ্রামের ভিতরে দিয়ে যাচ্ছি। মাঝমাঝে মনে হল এটা রাস্তা না বাড়ির উঠোন। গাড়ি চলল হেলতে, দুলতে লাফাতে, লাফাতে। বেলা এগারোটা নাগাদ এসে পৌঁছলাম খাঁন্দারানি লেকের ধারে। এরপর একটা ছোট্ট বাঁধের ওপর দিয়ে সরু লাল মোরামের রাস্তা ঢুকে গিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে। এই পথে গাড়ি নিয়ে আর এগোনো যাবে না।

খাঁদারানি বাঁধ
দূরে ওপারে ঝাড়খণ্ডের সীমানায় দেখা যায় ছোট ছোট টিলা পাহাড়ের সারি আর মাঝে বিশাল লেকের মধ্যে জেগে ওঠা ছোট ছোট কয়েকটা দ্বীপ যেন এখানে প্রকৃতিকে এক অপরূপ সৌন্দর্য্যে সাজিয়ে রেখেছে। আর যাওয়া গেল না। গাড়িটা সুবিধে মত জায়গায় রেখে আমরা গাড়ি থেকে নেমে এলাম।

লেকের ধারে
অকৃত্রিম জলাশয়। খান্দারানি লেক। অপূর্ব তার বিন্যাস। চোখ জুড়ানো দৃশ্য, স্বচ্ছ নীল জল আর পাহাড়ের সবুজ মিলেমিশে একাকার। মনোরম লেকের জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি, কিছু স্থানীয় মানুষ সেই জলে স্নান করছে, দু'একটা পাখি উড়ছে। এ যেন প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাস। ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রত্যেকে আপন খেয়ালে নিজের পছন্দমতো ছবি তুলতে শুরু করে দিলাম। লেকের পাশে বনের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলেছি। লোকজনের চিহ্ন চোখে পড়ল না। নজর গেলো একটা ওয়াচ টাওয়ারের দিকে।

ওয়াচ টাওয়ার
ওয়াচ টাওয়ার এর কাছে এসে দেখে মনে হলো নতুন তৈরি হয়েছে। এখনো সেভাবে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়নি। ওয়াচ টাওয়ারের উপরে উঠে দেখি সে এক অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্যমালা! ফিরে এলাম গাড়ির কাছে। লেকের একধারে শতরঞ্চি বিছিয়ে বসে পড়লাম। সাথে নিয়ে আসা ফ্রায়েড রাইস, বাটার পনীর আর আলুর দম দিয়ে সবাই মিলে পিকনিকের আমেজে এখানেই দুপুরের লাঞ্চটা সেরে নিলাম।

খাঁদারানির এই সৌন্দর্যেই পর্যটকদের হাতছানি দেয়
লাঞ্চের পর আবার কিছুক্ষণ ড্যামের উপর ঘুরে কয়েকটা ছবি তুলে ঘাগরার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। প্রথমবার এখানে আসা। ঘুরতে আসার আগে পুরো জায়গাটা গুগল ম্যাপ ঘেঁটে দেখে নিয়েছি। অচেনা কোনো জায়গার উদ্দেশ্যে বেরোলে গুগল ম্যাপের ওপর ভরসা করেই গাড়ি চালায়। গুগল যেদিকে নির্দেশনা দেয়, গাড়ির চাকাও সেদিকে ঘুরিয়ে দিই। এখানেও গুগল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ইন্টারনেট সমস্যার জন্য মাঝেমাঝে জিপিএস কাজ করছে না। আমাদের পথ মেঠো গ্রাম্য, দেহাতিদের মধ্যে দিয়ে। গ্রামবাসীদের সাহায্য নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে। কাঁচা রাস্তার দুপাশে সহজ সরল আদিবাসীদের গ্রাম, নানান রঙের বাহারি আলপনা আঁকা মাটির বাড়ি ঘর। অসংখ্য গরু, ছাগল, হাঁসের দলের সাইড দিয়ে গ্রামের ভিতর দিয়ে কোনোরকমে গাড়ি চালিয়ে চলেছি।

গ্রামের ভিতর দিয়ে চলেছি
পুরোটাই মোরাম বিছান ঢেউ খেলা গ্রাম্য পথ। গ্রাম পেরিয়ে একটা বড় গাছের কাছে এসে গাড়ি থেকে নামলাম। যাবার আগের প্রিপারেসন যা ছিল কিছুতেই মিলছে না, বুঝতে পারলাম আমরা ভুলপথে চলে এসেছি। মোরামের রাস্তাটা হঠাৎ একটা গড়ানে নেমে গেছে। সামনে বালির চর, কিছুটা নীচে বয়ে চলেছে তারাফেনি। তারাফেনির জল, পাথরে পাথরে পড়তে পড়তে সশব্দে এগিয়ে চলেছে। এখানে, জলপ্রপাতের ডাক আছে, কিন্তু সেটা নেহাতই বাচ্চার কান্না। তবে হ্যাঁ, ল্যান্ডস্কেপ, অতুলনীয় সুন্দর।

জঙ্গলের কোলে শুয়ে রয়েছে স্বচ্ছ, স্থির তারাফেনি
ডান দিকে দু’পাশে জঙ্গলের মাঝে জল, সেখানে মানুষের ভিড় জমে! ট্যুর-পার্টিদের হৈ হুল্লোড়, চেঁচামেচি হচ্ছে। বুঝে গেলাম এটাই 'ঘাগরা ঝর্ণা'; পিকনিক স্পট, বেড়ানোর জায়গা। গাড়ি যাওয়ার মতো রাস্তা নেই তাই রাস্তার একপাশে গাছতলায় গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে ঐদিকে এগিয়ে গেলাম। ঝর্ণার কাছে এসে দেখি তারাফেনি নদীর গোড়ালি ডোবা জল পেরিয়ে ওপাশের গ্রামগুলোতে অনায়সে চলে যাওয়া যায়।

পর্যটকদের ভিড়
ব্যাসাল্ট পাথরে মোড়া ছোট টিলাময় জঙ্গলভূমি। স্বচ্ছ, স্থির তারাফেনি নদী তার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে। নদীর বুকে অজস্র নুড়িপাথর আর ছোট ছোট মাছেদের নির্ভয়ে ঘোরাফেরা। তারাফেনির জলের ধারা প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে ব্যাসল্ট পাথরের গায়ে গর্ত তৈরি হয়ে সৃষ্টি করেছে এক ঝর্ণার, 'ঘাগরা ঝর্ণা'। এখন অবশ্য নদীতে তেমন স্রোত নেই। এই ঝর্ণার নিচে পাথরের প্রাকৃতিক গঠনশৈলী দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। এই সৌন্দর্যই পর্যটকদের মূল আকর্ষণ।

প্রকৃতির এই সৌন্দর্যই পর্যটকদের আকর্ষিত করে
যুগ যুগ ধরে ক্ষয়ের ফলে এখানকার ব্যাসাল্ট পাথরগুলো জল ভরার কলসির মতো আকার ধারণ করেছে। কূরমালি ভাষায় 'কলসি' কথার অর্থ 'গাগরি', স্থানীয় ভাষায় 'গাগরা' বলে। তার থেকেই এই 'ঘাগরা' নামের উৎপত্তি বলে অনুমান করা হয়। এখানে, ঝর্ণার ডাক ক্ষীণ হলেও ল্যান্ডস্কেপ অতুলনীয় সুন্দর। প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের টানে সারা বছরই ঘাঘরায় পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। ফটোগ্রাফারদের জন্য জায়গাটা আদর্শ। এখানে বেশ কয়েকটা সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে। আমাদের ফটোগ্রাফার 'স্বরূপ' পাথরের বিভিন্ন কোণ থেকে ফটো তোলার জন্য ঘোরাঘুরি শুরু করে দিলো। আমরা দু'জনে তাকে সঙ্গ দিলাম।

ঘাগরায় আমরা তিনজন
ঘাঘরা থেকে তারাফেনি ব্যারেজ খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু খান্দারানি থেকে ফেরার পথে আমরা রাস্তা ভুল করেছিলাম, তাই ঘাঘরা থেকে আবার গ্রামের পথ ধরে মেন রাস্তায় উঠলাম। ডানে ঝিলিমিলির দিকে গেছে। বাঁয়ে হদরামোড় পেরিয়ে আর একটু এগিয়ে পড়ল বামুনডিহা মোড়। এবার নীল সাইন বোর্ড, বাঁয়ে হাফ কিমি ঘাগরা সোজা চার কিমি তারাফেনি ব্যারেজ। বামুনডিহা মোড় থেকে সোজা পুলিশ ক্যাম্প পেরিয়ে চলে এলাম তারাফেনি ব্যারেজ। ছোট আকারের ড্যাম। আহামরি কিছু নয়। তারাফেনি নদীর জল আটকে তৈরি হয়েছে এই ব্যারেজ। ড্যামের ওপর দিয়ে রাস্তাটা বারিকুল কিংবা ঘুরে শিলদায় গিয়ে মেশে।

তারাফেনি ব্যারেজ
তারাফেনি ব্যারেজের উল্টোদিকে অসংখ্য খেজুর গাছের সারি। এখানে আমাদের প্রাপ্তি বলতে কেবল টাটকা নির্ভেজাল খেজুরের গুড়। ব্যারেজের নীচে নেমে, এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি সারতে সারতে বিকেল হয়ে গেলো।

তারাফেনি নদী
তারাফেনি ব্যারেজের পাশেই দেখি একটা খড়ের চালা দেওয়া ঝুপড়িতে খেজুর গুড় আর পাটালি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেখানে কাউকে দেখতে পাওয়া গেলো না। সৌমেন কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে ফোন নম্বর জোগাড় করে ডেকে নিয়ে এলো খেজুর গুড়ের বিক্রেতাকে।

তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু খেজুরের গুড়
কেনাকাটা পর্ব শেষ হলো। বিকেল চারটেতেই দিনের আলো কমে এসেছে। জঙ্গলাকীর্ণ পথে আবার ফিরতে হবে। সুতরাং আর দেরি না করে এবার বাড়ি ফেরা যাক। আবার থানা, বিডিও অফিস ছেড়ে ধুলো উড়াতে উড়াতে শেষে ব্যাক টু ইন্দিরা চক; এরপর মেন রাস্তা ধরে শিলদা পেরিয়ে সোজা বাড়ি।

গুড় তৈরির কারিগরের সাথে আমরা
» প্রয়োজনীয় তথ্য

বেলপাহাড়ীর আশপাশে ঘুরে দেখার মতো অনেক জায়গা রয়েছে যেমনঃ- ঘাগরা জলপ্রপাত, তারাফেনি ব্যারেজ, কানাইসোর পাহাড়, গজডুংরি, গাড়রাসিনি পাহাড়, খাঁন্দারানি লেক, লালজল গুহা, ময়ূরঝর্ণা, আমঝর্ণা, কাঁকড়াঝোড় জঙ্গল ও ভৈরব থান, কেটকি ঝর্ণা লেক, হাঁসা ডুংরি (শ্বেত পাথরের পাহাড়), চাতন ডুংরি প্রাগ ঐতিহাসিক গুহা, ঢাঙ্গিকুসুম এর হুদহুদি জলপ্রপাত ইত্যাদি। এখানে ঘুরতে এলে ঝাড়গ্রামে থাকা সবচেয়ে ভালো। খাওয়াদাওয়া করার জন্য যেতে পারেন বেলপাহাড়ির 'কাঁচা লঙ্কা রেস্টুরেন্ট'-এ। এখন বেলপাহাড়িতে থাকার জন্য অনেক হোম স্টে হয়েছে যদিও আমার নজরে কেবলমাত্র গাড়রাসিনির কাছে আগুইবিলে 'পবিত্রা হোমস্টে' নজরে পড়েছে।

» বেলপাহাড়ীতে থাকার জন্য লজ ও গেস্ট হাউস
  • তারাফেনি কটেজঃ- +৯১ ৮৯০০৩৬০২২২, +৯১ ৯৭৩৩৭৯৫৩৪০
  • বিনপুর পঞ্চায়েত সমিতি গেস্ট হাউসঃ- +৯১ ৯৮০০০৩৩৬৩৩
  • লাল পিঁপড়ে ফ্যামিলি গেস্ট হাউসঃ- +৯১ ৭৫০১৬৪৪৭৮৮, +৯১ ৭০০১১৮৪৬১৫
  • অতিথি নিবাসঃ- +৯১ ৯৪৭৪৪০৫৪৬৪, +৯১ ৯৭৩২৭৩৯৮৯৭
  • অরণ্য গেস্ট হাউসঃ- +৯১ ৯৬৪৭২৭৫৫৫৩, +৯১ ৯৬৭৯১৭৫৫৫৩
  • বিজলি ভবনঃ- +৯১ ৯৯৩২৬৮৮৭২৩, +৯১ ৯৬৭৯৬৩২৪৩১, +৯১ ৮১৬৭৭৬৩৯৫৮
  • রাজ হোমস্টেঃ- +৯১ ৮৯৭২৯১৮৫৮৯,  +৯১ ৮৬৭০৩৪২০৮৪
  • তিতলি হোমস্টেঃ- +৯১ ৯৬৪৭২৯৭২৮৩
  • তৃপ্তি হোটেল এন্ড হোমস্টেঃ- +৯১ ৮৬৭০৩৪২০৮৮, +৯১ ৯৭৩২৫৩১০৪৯
  • বাগানবাড়ি হোমস্টেঃ-+৯১ ৭৫৪৭৯২৮২০২, +৯১ ৮৯২৭৬৪২৫৭৫
  • পবিত্রা হোমস্টেঃ- +৯১ ৮১১৬৫৭৭৩৩০, +৯১ ৬২৯৫২৩১৪১৬
  • বেলপাহাড়ি গেস্ট হাউসঃ- +৯১ ৮৯৭২৯৯৯৯২৬
  • বেলপাহাড়ি ফরেস্ট বাংলোঃ- (ঝাড়গ্রাম ফরেস্ট অফিস) +৯১ ৩২২১২৫৫০১০
» বেলপাহাড়িতে খাওয়াদাওয়ার জন্য রয়েছে
  • 'কাঁচা লঙ্কা রেস্টুরেন্টঃ- +৯১ ৮৯৪৫৮৭৬৭১৯
  • তৃপ্তি হোটেলঃ- +৯১ ৮৬৭০৩৪২০৮৮, +৯১ ৯৭৩২৫৩১০৪৯
  • হোটেল অভিনন্দনঃ- +৯১ ৯০৮৩৪৯৭২২৮
  • খেয়াতরী হিন্দু হোটেলঃ- +৯১ ৯৯৩২৩৪৬২০৭, +৯১ ৯৯৩৩০৭৪৫৮৯
  • হালদার হোটেলঃ- +৯১ ৯৭৩৩৭৫৯৫২৫
» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল
Continue Reading
Arabinda Pal
1 Comments

You Might Also Like

দেবী দুর্গা এখানে ‘মা গুপ্তমণি’

দেবী দুর্গা এখানে ‘মা গুপ্তমণি’


গুপ্ত অবস্থা থেকে প্রকাশ্যে এসেছিলেন বলে দেবীর নাম 'গুপ্তমণি'। এখানে বনচন্ডী গুপ্তমণি নামে খ্যাত। কারও কাছে তিনি বনদেবী, আবার কেউ বলেন বনদুর্গা। মূলত লোধা, শবর সম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবী হলেও মা গুপ্তমণি সাধারণ মানুষের কাছে দুর্গা রূপেই পূজিত হন। ঝাড়গ্রামের কাছে কোলকাতা-মুম্বাই ন্যাশনাল হাইওয়ের ধারে রয়েছে এই বনচন্ডীর মন্দির। দেবীর নামেই জায়গাটার নাম‌ গুপ্তমণি। স্থানীয়দের কাছে এই মন্দির খুবই জাগ্রত। বহু দূর দূরান্ত থেকেও মানুষ বিভিন্ন মনস্কামনা নিয়ে পুজো দিতে আসে এই মন্দিরে। কোনও উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ পুরোহিত নন, পূজো করেন লোধা-শবর সম্প্রদায়ের পুরোহিত। লোধা পুরোহিতকে বলা হয় দেহুরি। জঙ্গলমহলের দেবী এই 'গুপ্তমণি'-র পরিচিতি বাংলা ও ওড়িশা ছাড়িয়ে দক্ষিণভারত পর্যন্ত বিস্তৃত। কথিত আছে, ঝাড়গ্রামের জঙ্গলে গাছের নীচে গুপ্ত অবস্থায় গোপন-পথ পাহারায় থাকতেন দেবী দুর্গা। স্থানীয় বিশ্বাস, মা গুপ্তমণি পথের দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে রক্ষা করেন। তাই অধিকাংশ গাড়ির ড্রাইভার ও যাত্রীরা নিরাপত্তা কামনায় এই মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেবীকে খুশি রাখার জন্য দেবীস্থান লক্ষ্য করে খুচরো টাকা প্রণামি হিসাবে ছোড়েন। ইতিহাস আর স্থানীয় গল্প-মিথের মিলমিশে গড়ে ওঠা এই দেবীস্থান থেকে কিছুদিন আগে ঘুরে এলাম...

চলেছি অজানা কোনো উদ্দেশ্যে
শনি-রবি ছুটির দিনগুলোতে ইদানিং আমি ও উৎপল মাঝে মাঝেই একটু বেরিয়ে পড়ি অজানা কোনো স্থানের উদ্দেশ্যে। এভাবেই ঠিক গত শনিবার উৎপল আর আমি দুজনে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের পথ পরিক্রমা শুরু হলো, গাড়ি আপন গতিতে চলতে শুরু করলো। নিরুদ্দেশের পথিকের মত অজানা পথে ভেসে চলেছি। গন্তব্য জানা নেই। রাস্তায় বেরিয়ে কোনদিকে যাবো ঠিক করতে পারছি না। উৎপল বললো লোধাশুলির দিক থেকে চলো একবার ঘুরে আসি। আমিও সহমত পোষণ করলাম। খড়্গপুর চৌরঙ্গী পেরিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে জামশেদপুরের দিকে। বহু বছর আগে খড়্গপুরে থাকাকালীন এই রাস্তায় গেছি তারপর আর যাওয়া হয়নি। কংক্রিটের ঝাঁ-চকচকে রাস্তাটা সদ্য বাই লেন থেকে ফোর লেন রাস্তায় পরিণত হয়েছে। নিমপুরার কাছে এসে দেখি জায়গাটা একেবারে পরিবর্তন হয়ে গেছে। কালাইকুণ্ডা পেরিয়ে রাস্তার আশেপাশে জঙ্গল আর প্রকৃতির সবুজ বন্যা দেখে চোখ-মন জুড়িয়ে গেল। রাস্তায় একটা সুন্দর বাঁকে খোলা সবুজ মাঠে বিচরণ করা অসংখ্য গরুর পাল দেখে উৎপলকে গাড়ি থামাতে বললাম। সেখানে প্রকৃতিকে পেছনে রেখে নানাভাবে ল্যান্ডস্কেপ ছবি তুলতে থাকলাম। রাস্তার ধারে নানারকম বুনো আগাছার ঝোপঝাড়ে ঠাসা। সেই ঝোপের মধ্যে দেখি অদ্ভুত সুন্দর নীল রঙের অসংখ্য বুনোফুল ফুটে আছে। গুগল লেন্স অ্যাপে সার্চ করে দেখলাম সে ফুলের নাম নীলকাঠি। কেউ কেউ একে বলে নীলের ঝি। দীর্ঘ সরু সবুজ জটার বুনো সুন্দরের বাহার দেখে তাকেও ক্যামেরা বন্দি করতে ছাড়লাম না।

সবুজ মাঠে বিচরণ করা অসংখ্য গরু বাছুর
দূর আকাশে দেখি কালো মেঘ ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। গাড়িতে উঠে বসলাম, সুন্দর মসৃন রাস্তা দেখে উৎপল নিজেকে আর সামলাতে পারছে না। মন তখন বলে উঠলো 'চলো যাই চলে যাই দূর বহুদুর'। গাড়ি এগিয়ে চলেছে। সামনে বালিভাষায় পড়লো টোলপ্লাজা। টোল পার হতেই গাড়ি আবার ছুটতে শুরু করল। এভাবে কখন লোধাশুলি ছাড়িয়ে বহুদূর চলে এসেছি জানিনা।

বালিভাষা টোলপ্লাজা
ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে অনেকটা রাস্তা চলে এসেছি। পথে পড়ল এক ছোট্ট নদী – 'ডুলুং'। ব্রীজ পেরিয়ে একটা মোড় দেখে গাড়ি থামালাম। দেখি একটা রাস্তা বামদিকে টার্ন নিয়ে গোপীবল্লভপুরের দিকে চলে গেছে। সেখানে কর্মরত এক ট্রাফিক পুলিশকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম জায়গাটার নাম ফেকো মোড়। অর্থাৎ আমরা লোধাশুলি ছাড়িয়ে প্রায় সতেরো কিলোমিটার দূরে চলে এসেছি। গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আবার ফিরে চললাম। ফেরার সময় উৎপলকে বললাম এদিকে যখন এসেছি তখন গুপ্তমণিতে মায়ের দর্শন করেই যায়। এ দিকে, দিনের আলো কমে আসছে সেটা খেয়ালই ছিল না। গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিলাম। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গাড়ি ফিরে চলেছে দ্রুত গতিতে। লোধাশুলি ছাড়িয়ে গাড়ি এসে থামলো গুপ্তমণি মন্দিরের সামনে।

চলে এলাম গুপ্তমণিতে
ন্যাশনাল হাইওয়ের একদম গা ঘেঁষেই এই মন্দির। গাড়ি থেকে নেমে চললাম মায়ের দর্শন করতে। জায়গাটা শুনশান। পাঁচটা বেজে গেছে, আলো ততক্ষনে অনেক কমে এসেছে। করোনা আতঙ্কের কারণে লোকজন সেরকম নেই বললেই চলে। আশপাশে কয়েকটি পুজোর সামগ্রীর দোকান ছাড়া আর কিছুই দেখা গেলো না। গেটের বাইরে জুতো খুলে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করলাম। ছোট্ট একেবারে সাদামাটা মন্দির। দেখে মনে হলো খুব বেশী দিনের পুরাতন নয়। ভেতরে হাল্কা আলোতে মায়ের অবস্থান কোনওরকমে দেখা গেলো। স্থানীয় লোকেদের কাছে জানা গেলো মন্দিরের ভেতরে বহুবার বৈদ্যুতিক আলো লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু প্রতিবারই সেই চেষ্টা বিফল হয়েছে। আসলে গোপনীয়তাই বোধহয় এই দেবীর পছন্দ তাই হাল্কা আলো পছন্দ করেন আর সেই কারণেই মন্দিরে জ্বলে শুধুই মোমবাতি আর প্রদীপ। আজও প্রচলিত নিয়ম অনুয়ায়ী এখানে দেবীর প্রতিমা নয়, পুজো হয় একটা পাথরের। আড়াল করে রাখা গুপ্তপথের ওই পাথরেই হয় দেবী চন্ডীর পুজার্চনা। তবে মূল পাথরের দেবী এখন গৌণ হয়ে পড়েছে। মন্দিরে উপাস্য দেবতা হিসাবে রয়েছে একটি পাথরের মূর্তি যা দেবী মনসা রূপে পূজিত হয়। এছাড়া রয়েছে দেবী দুর্গার ধাতুমূর্তি ও একটি সিংহবাহিনীর মূর্তি। মন্দিরের ভেতর ও বাইরের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর খোদাই চিত্র।

দেবীর মন্দির

গুপ্তমণির আর্বিভাবের ইতিহাস

গুপ্তমণির আর্বিভাব সম্পর্কে ইতিহাস-মিথের অনেক গল্পকথা প্রচলিত আছে। একসময় শুকনিবাসার এই জায়গাটা ছিল গভীর ঘন জঙ্গলে ঢাকা। মূলত লোধা-শবর সম্প্রদায়ের বাস ছিল। শিকারই ছিল যাদের একমাত্র জীবন ও জীবিকা। এই শুকনিবাসা গ্রামে শবর সম্প্রদায়ের নন্দ ভক্তা একদিন স্বপ্নাদিষ্ট হন। দেবী চন্ডী তাঁকে স্বপ্নে বলেন, শুকনিবাসার জঙ্গলে মাটির মধ্যে তিনি গুপ্ত অবস্থানে রয়েছেন। তিনি নিত্যপূজো পেতে চান। রাস্তার ধারে একটা শাহাড়া (শ্যাওড়া ) গাছের নীচে ঝোপের মধ্যে যেখানে একটা টাটকা কাটা ডাল পোঁতা আছে, সেখানে মাটির মধ্যে গুপ্ত অবস্থায় তিনি আছেন। সে যেন তাঁর পূজোর ব্যবস্থা করে। দেবীর এই স্বপ্নাদেশের কথা শুনে নন্দ ভক্তা সেই গাছের নীচে ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করে দেখেন যে সত্যিই মাটির মধ্যে দেবী শিলারূপে আছেন। তখন সেখানেই বুনো ফল আর ফুল দিয়ে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করে নিত্যপূজো শুরু করেন। মাটির ভেতরে গুপ্ত অবস্থায় ছিলেন বলে দেবীর নাম হয় 'গুপ্তমণি'। বিষয়টা জানতে পেরে মল্লরাজ জঙ্গল পরিষ্কার করে ঐ জায়গায় মা গুপ্তমণির মন্দির তৈরি করে দেন এবং শুকনিবাসা এলাকার মালিকানা নন্দ ভক্তার নামে দানপত্র করে তাকে মন্দিরের দেহুরি ও সেবাইত হিসেবে নিযুক্ত করেন। সেই থেকে এখানে নন্দ ভক্তার উত্তরাধিকারীরা বংশানুক্রমে সারা বছর ভাগ করে এই মন্দিরের পূজোর দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তবে এখন আর সেই পুরাতন মন্দিরের কোন অস্তিত্ব নেই। ঘটনার কোন ঐতিহাসিক সত্যতাও আছে কিনা জানা নেই।

গুপ্তমণি মায়ের মন্দির
আবার রাজা মল্লদেবের হাতিকে ঘিরে অন্যরকম আর একটা গল্প শোনা যায়। ঝাড়গ্রামে তখন মল্লরাজাদের রাজত্ব। রাজা নরসিংহ মল্লদেব তখন সিংহাসনে আসীন। মল্লদেবের রাজপ্রাসাদ ছিল গভীর জঙ্গলে ঘেরা। মল্লরাজা তাঁর রাজস্ব ও রাজ্য রক্ষার জন্য সেই জঙ্গলের ভেতরে একটা গোপন পথ তৈরি করেছিলেন। এই গুপ্তপথের সাহায্যে মল্লরাজ আকস্মিক হামলা থেকে বহু যুদ্ধ জয় করেছেন। তাই অনেকে মনে করতেন দেবী চন্ডী এই গোপন পথ আগলে রাখতেন। হঠাৎ একদিন রাজার প্রিয় হাতি নিখোঁজ হয়ে গেল। রাজার সৈন্যসামন্তরা চারদিকে ছোটাছুটি করে খুঁজে আনার চেষ্টা করল। কিন্তু হাতিটিকে খুঁজে পাওয়া গেল না। শেষে রাজার হারিয়ে যাওয়া হাতিটিকে খুঁজে পাওয়া গেলো রাজার তৈরি গুপ্তপথের সামনে। একটা গাছের গায়ে বুনো লতা দিয়ে বাঁধা রয়েছে। যাদের হারিয়ে মল্লদেবের এত প্রতিপত্তি, সেই শবরপতি নন্দ ভক্তা স্বয়ং দাঁড়িয়ে ঐ হাতির সামনে। রাজা মল্লদেব তখন বুঝতে পারলেন শবরপতি নন্দ ভক্তা জঙ্গলের মধ্যে তাঁর ঐ গুপ্তপথের সন্ধান পেয়ে গেছেন। শবরপতি গুপ্তপথ জেনে ফেলায় রাজা আর তার রাজ্যের নিরাপত্তা সঙ্কটে পড়ে গেলো। নিজেদের অধিকার রক্ষায় শবরেরা তখন রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। শবর দলপতির কাছে পরাজিত হয়ে বুদ্ধিমান রাজা তখন সন্ধির কৌশল করে জঙ্গলের ওই গুপ্তপথ রক্ষার দায়িত্ব শবরপতি নন্দ ভক্তার হাতে তুলে দেন। রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যে নিজেদের অধিকার ধরে রাখা যাবে না সেটা বুঝতে পেরে ওই শবরেরা রাজার তৈরি জঙ্গলের গুপ্তপথ আগলে রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকে শবরেরা ঐ গুপ্তপথকে আড়াল করে রাখা পাথরের উপর বুনো ফুল আর ফল দিয়ে বনচন্ডীকে প্রতিষ্ঠা করে। শুরু হয় শবরদের চন্ডী আরাধনা। যেহেতু ঐ জায়গাটা রাজার গুপ্তপথ ছিল তাই শবরদের চন্ডীর পরিচয় হয় 'গুপ্তমণি' হিসেবে।

দেবী গুপ্তমণি চন্ডী
মন্দির লাগোয়া একটা টিনের শেডের মধ্যে দেখতে পেলাম পোড়ামাটির তৈরি হাতি ঘোড়ার ছলনস্তূপ। কিছু ছলন আবার লাল সুতোয় বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা। জঙ্গলমহলের প্রায় প্রত্যেকটি গ্রামেই দেখা যায় এই ছলনের উপস্থিতি। 'ছলন' হল পোড়ামাটির তৈরি বিভিন্ন পশু মূর্তি। তবে ছলন হিসাবে হাতি ও ঘোড়ার চলন বেশি। কোনও মনস্কামনা পূর্ণ হলে ভক্তগণ তাদের উৎসর্গ ও মানত করা পোড়ামাটির হাতি ও ঘোড়া মন্দিরের পাশে ঐ ঘরে বেঁধে যায়। মন্দিরের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে বেশ কয়েকটা দোকান। সেখান থেকে দেবীর পুজোর নৈবেদ্য নারকোল, কলা, জবাফুল ইত্যাদি পাওয়া যায়।

দেবীর কাছে উৎসর্গ করা ছলন
মন্দির দর্শন করা হলো... কিছুদূর এগিয়ে কালাইকুণ্ডার কাছে গাড়ি থামিয়ে সঙ্গে ফ্লাস্কে করে নিয়ে যাওয়া গরম চায়ে চুমুক দিয়ে ভাবলাম কয়েকটা ল্যান্ডস্কেপ ছবি নেবো। কিন্তু মেঘ যেন আমাদের সঙ্গে শত্রুতা করছে আজ। কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। সারা শরীরে লাগলো হালকা ঠান্ডা একটা অনুভূতি। গাড়িতে উঠে বসলাম, গাড়ি ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করলো। গাড়ি যতই সামনে এগোয় ততোই মেঘ ধেয়ে আসছে আমাদের দিকেও। বৃষ্টির দানা একফোঁটা-দু'ফোঁটা করতে করতে অঝোর ধারায় ঘিরে ফেললো একসময়। সারাদিনের চমৎকার এক অনুভূতি নিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলাম দুজনে।

বনপথে গহন মেঘের ছায়া ঘনায়
» পথ নির্দেশিকা
© ছবি ও লেখাঃ- অরবিন্দ পাল (তথ্যসূত্রঃ- আনন্দবাজার পত্রিকা, নিউজ 18 বাংলা)
GUPTOMONI, JHARGRAM, WEST BENGAL
Continue Reading
Arabinda Pal
1 Comments

You Might Also Like

[name=Arabinda Pal] [img=https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEia50rmuKEAcbGUbQKvAbzUmdviiIhm-LeVlsEEdFx_xtGfyvx8O02yFVuJemgswzSA8PoMcN-XW0AcinKr9iq28lHK43Z4TFFyL7pJyGGxLNx9LGn0cLvPz0lUJzNrWBo9n_NyxGLjDII/h120/IMG_2788.jpg] [description=পর্যটক হিসাবে নয়, একজন ভ্রমণকারী হিসাবে বেড়ানোটা আমার কাছে একটা নেশা এবং ফটোগ্রাফিতেও আমার ভীষণ শখ। তাই একজন ভ্রমণকারী হিসাবে আমার এই ব্লগে নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা ও ছবিগুলো যদি আপনাদের ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই আপনাদের মতামত কমেন্টসের মাধ্যমে জানাতে ভুলবেন না।] (facebook=https://www.facebook.com/groups/2071066419824586/user/100002484831922) (twitter=Twitter Profile Url) (instagram=https://www.instagram.com/arabindapal2020/) (bloglovin=Blogvin Profile Url) (pinterest=https://www.pinterest.com/arabindapalbrb/) (tumblr=Tumblr Profile Url)

Follow @Arabinda Pal